যিশুরূপে নিজের ছবি পোস্ট করে ট্রাম্প কি ‘ধর্ম অবমাননা’ করেছেন
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে গত রোববার পোপ লিও চতুর্দশের বিরুদ্ধে একের পর এক কটূক্তির পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের একটি ছবি শেয়ার করেছিলেন। ওই ছবিতে তাঁকে যিশুখ্রিষ্টের মতো করে দেখানো হয়।
ছবিটি দেখে মনে হয়েছে, সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। ছবিতে ট্রাম্পকে একজন আরোগ্যদাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে; পরনে ছিল বাইবেল-অনুপ্রাণিত চিত্রকলায় দেখা যাওয়া লাল ও সাদা রঙের পোশাক।
ছবির পটভূমিতে দেখা যায়, ভক্তদের মাথার ওপরের দিকে উড়ন্ত মার্কিন পতাকা, শিকারি ইগল ও যুদ্ধবিমান। সেখানে ট্রাম্পের চরিত্রটি একজন অসুস্থ ব্যক্তির কপালে একটি হাত রেখেছে, আর অন্য হাত থেকে নির্গত হচ্ছে ঐশী আলো।
খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অনুসারীরা এ ছবির ব্যাপক নিন্দা জানিয়ে একে ‘ধর্ম অবমাননা’ বলেছেন। সমালোচকদের এই দলে ট্রাম্পের ‘মাগা’ সমর্থকেরাও রয়েছেন।
ডানপন্থীদের কেউ কেউ আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। মার্জোরি টেইলর গ্রিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘এটা শুধু ধর্ম অবমাননা নয়, এটা অ্যান্টিক্রাইস্ট বা যিশুবিরোধী মনোভাব।’
ছবিটি পোস্ট করার পর আলোচনা–সমালোচনা শুরু হলে পরদিন সোমবার পোস্টটি মুছে ফেলা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেকে যিশু হিসেবে উপস্থাপন করার বিষয়টিও অস্বীকার করেন।
ট্রাম্প এক সাংবাদিককে বলেন, ‘এটাতে আসলে আমাকে একজন চিকিৎসক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি মানুষকে সুস্থ করে তুলছেন। আর আমি সত্যিই মানুষকে ভালো করে তুলি।’
একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প ধর্মীয় আবেগ ও আত্মপ্রচারণা—দুটিকেই এমন মাত্রায় নিয়ে গেছেন, যা তাঁর পূর্বসূরিদের কেউ কখনো করেননি। কিন্তু এই দুই প্রবণতাকে একত্র করার ফলে ছবিটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক পদকে ঘিরে অস্বাভাবিক রকম তীব্র ধর্মতাত্ত্বিক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
‘ব্লাসফেমি’ বা ‘ধর্ম অবমাননা’ শব্দটি ইংরেজিতে এসেছে ১৩ শতকে, প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘ব্লাসফেমিয়া’ থেকে ফরাসি ও লাতিন ভাষার মাধ্যমে। ‘ব্লাসফেমি’ বলতে সাধারণত এমন কথা বা কাজকে বোঝায়, যা ঈশ্বর, পবিত্র ব্যক্তি বা পবিত্র বস্তুর প্রতি অশ্রদ্ধা বা অবমাননা প্রকাশ করে।
তবে ঈশ্বর বা ঐশী বিষয়ের অবমাননাকে বোঝানোর আগে শব্দটি মূলত আরও বিস্তৃত অর্থে—কারও বিরুদ্ধে অপবাদ বা কুৎসা রটানোর কাজ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। এমনটাই বলেছেন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রারম্ভিক খ্রিষ্টধর্ম ও প্রাচীন ইহুদিধর্ম–বিষয়ক অধ্যাপক কিম হেইন্স-আইটজেন।
খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীরা যখন যিশুকে ঈশ্বরের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন, তখন ‘ব্লাসফেমি’ বা ধর্ম অবমাননা ধারণার পরিসরও বিস্তৃত হয় বলে জানান হেইন্স-আইটজেন। এর ফলে যিশুকে অবমাননা করে কথা বা কাজও ধর্ম অবমাননার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
সময়ের সঙ্গে এর পরিসর আরও বিস্তৃত হয়ে গির্জার মতো প্রতিষ্ঠান, সন্ত ও পোপকেও অন্তর্ভুক্ত করা শুরু হয়। এমনকি খ্রিষ্টধর্মের বাইরের ধর্মগুলোর ক্ষেত্রেও এ ধারণা প্রয়োগ হতে থাকে।
১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি বিতর্কিত লেখক সালমান রুশদির উপন্যাস ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’–কে ইসলাম ধর্মের অবমাননা বলে ঘোষণা করে লেখককে হত্যার নির্দেশ দিয়ে একটি ফতোয়া জারি করেছিলেন।
তখন ইংরেজি ভাষার গণমাধ্যমে বলা হয়, রুশদিকে ‘ব্লাসফেমির’ অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এবার ডানপন্থী খ্রিষ্টানরা এমন এক প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ‘ধর্ম অবমাননার’ মুখোমুখি হয়েছেন, যাঁকে তাঁরা সাধারণত নিজেদের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে এর আগেও ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ উঠেছে। গত বছর ট্রাম্প একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্মিত ছবি পোস্ট করেন, যেখানে তাঁকে পোপ হিসেবে দেখানো হয়; কনক্লেভ (নতুন পোপ নির্বাচনের প্রক্রিয়া) ঘনিয়ে আসার ঠিক আগমুহূর্তে এ ঘটনা ক্যাথলিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
আর রোববারের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টের এক সপ্তাহ আগে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত ইস্টার অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা পলা হোয়াইট-কেইন প্রেসিডেন্টকে যিশুখ্রিষ্টের সঙ্গে তুলনা করেন; তিনি ট্রাম্পের আইনি লড়াইগুলোকে যিশুর যন্ত্রণার সঙ্গে তুলনা করেন।
কিন্তু খ্রিষ্টানদের কারও কারও কাছে প্রেসিডেন্টের নিজেকে যিশু হিসেবে উপস্থাপন করাকে সীমা অতিক্রম বলেই মনে হয়েছে।
কারও কারও মতে, ধর্ম অবমাননার বিষয়টি শুধু খ্রিষ্টের সঙ্গে তুলনা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন ফেইথ অ্যান্ড জাস্টিসের প্রধান ও পরিচালক জিম ওয়ালিস ছবিটিতে যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এটি যিশুর দুটি মূল শিক্ষাকে অসম্মান করে—একটি হলো তাঁর সেই উক্তি, ‘শান্তি স্থাপনকারীরা ধন্য’ এবং অন্যটি হলো ‘সবচেয়ে অবহেলিতদের প্রতি তাঁর উদ্বেগ’।
তবে ট্রাম্পের ছবি নিয়ে খানিকটা ভিন্নমত পোষণ করেন ডেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও ক্যাথলিক ধর্মতাত্ত্বিক ডেনিস ডয়েল। তিনি বলেন, ধর্ম অবমাননা হয়েছে কি না, সে সিদ্ধান্তে আসার আগে অভিপ্রায় জানা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে তিনি ট্রাম্পকে ‘ব্লাসফেমির’ অভিযোগে অভিযুক্ত করতে অনিচ্ছুক।
ডয়েল বলেন, ‘কার্যত তিনি যা করেছেন, তা ধর্ম অবমাননা। তবে নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি কি সত্যিই একজন ধর্ম অবমাননাকারী? আমার মনে হয়, এর চূড়ান্ত বিচার কেবল ঈশ্বরই করতে পারেন।’