স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ‘চলমান ক্ষুধা পরিস্থিতির মধ্যে শান্তি অন্বেষণ করা দুরূহ। আর শান্তি না থাকলে আমরা ক্ষুধাও দূর করতে পারব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত সত্য হলো, পুতিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে খাবার নিয়ে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছেন।’

জার্মানিতে গত জুনে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি–৭–এর সম্মেলন থেকে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখতে ৫০০ কোটি ডলার অর্থ ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ দ্রুততার সঙ্গে এই অর্থছাড় করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনে রুশ হামলা বহুবিধ বৈশ্বিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত দক্ষিণের দেশগুলো বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে।’

এটা স্পষ্ট যে ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ ও এর জেরে বিশ্ববাজারে খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা পরবর্তী মৌসুমের আবাদেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আলভারো লারি, ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্টের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ তাঁর বক্তব্যে ইউক্রেন থেকে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে থাকা আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ায় গম সরবরাহের খরচ বহন করার ঘোষণা দিয়েছে।

এদিকে স্থানীয় সময় আজ বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের। এর আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন জানান, বাইডেন তাঁর ভাষণে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে নতুন সহায়তার ঘোষণা দিতে পারেন।

ইউক্রেন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ শস্য সরবরাহ করা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে রুশ হামলা শুরুর পর থেকে শস্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে গমসহ বিভিন্ন শস্যের দাম বাড়ে। দেশে দেশে বেড়ে যায় খাবারের দাম।

তবে এ জন্য রাশিয়ার পক্ষ থেকে মস্কোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করে। তবে পশ্চিমাদের দাবি, তারা রাশিয়ার কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা দেয়নি।

এই সংকট দূর করতে উদ্যোগী হয় জাতিসংঘ ও তুরস্ক। গত জুলাইয়ে তাদের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তিতে পৌঁছায় রাশিয়া ও ইউক্রেন। এই চুক্তির ফলে কৃষ্ণসাগরসংলগ্ন ইউক্রেনের বন্দরগুলো থেকে শস্যবাহী জাহাজ চলাচলের বাধা দূর হয়। তবে এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন পুতিন। তাঁর দাবি, ইউক্রেন থেকে ছেড়ে যাওয়া শস্যবাহী বেশির ভাগ জাহাজের গন্তব্য ছিল ইউরোপের ধনী দেশগুলো। গরিব দেশগুলো এই চুক্তির সুফল পায়নি।

চলমান ক্ষুধা পরিস্থিতির মধ্যে শান্তি অন্বেষণ করা দুরূহ। আর শান্তি না থাকলে আমরা ক্ষুধাও দূর করতে পারব না। প্রকৃত সত্য হলো, পুতিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে খাবার নিয়ে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছেন।
পেদ্রো সানচেজ, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী

এদিকে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদে চলতে থাকলে বিশ্ববাজারে সার সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে। এ বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্টের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাওয়া আলভারো লারি সতর্ক করে বলেছেন, ‘এটা স্পষ্ট যে ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ ও এর জেরে বিশ্ববাজারে খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা পরবর্তী মৌসুমের আবাদেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’

সংকট নিরসনে দ্রুত, দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আলভারো লারি আরও বলেন, ‘এই সংকট সমাধানের উপায় আমরা জানি এবং সমাধান করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আমাদের রয়েছে। তবে এখন যেটা নেই তা হলো, রাজনৈতিক সদিচ্ছা।’

জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পক্ষ থেকে গত জুনে একই যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২১ সালে বিশ্বের ৭০ কোটি থেকে ৮৩ কোটি মানুষ চরম খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে পড়েছে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। ২০২০ সালের তুলনায় গত বছর এই সংখ্যা ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। আর ২০১৯ সালের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১৫ কোটি। বিশ্বজুড়ে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার জন্য মোটাদাগে করোনা মহামারিকে দায়ী করা হয়েছে প্রতিবেদনে। চলতি বছর ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেজ সম্প্রতি বলেছেন, ‘বিশ্বের মানুষের মুখে তুলে দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত খাবার রয়েছে। তবে সমস্যা হলো, খাবার সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়া। খাবার থাকলেও তা মানুষের মুখে তুলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’ এই সংকট আগামী বছরের আগে দূর না–ও হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন