নভোচারীর অসুস্থতার কারণে প্রথমবারের মতো আগেই মহাকাশ মিশন শেষ করল নাসা
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) অবস্থানকারী চারজন নভোচারী বুধবার দিবাগত মধ্যরাতের পর নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন নভোচারী গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। মূলত এ কারণে নির্ধারিত সময়ের কয়েক সপ্তাহ আগে তাঁরা আইএসএসে নিজেদের মিশন শেষ করতে বাধ্য হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (নাসা) ইতিহাসে কোনো নভোচারীর স্বাস্থ্যজনিত কারণে নির্ধারিত সময়ের আগে মিশন শেষ করার ঘটনা এটাই প্রথম।
নভোচারীদের নিয়ে স্পেসএক্সের ক্যাপসুলটি বুধবার দিবাগত রাত পৌনে একটার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান দিয়েগো উপকূলবর্তী প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদে অবতরণ করে। এর আগে এটি মহাকাশ স্টেশন থেকে প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে পৃথিবীর দিকে নেমে আসে।
নাসার এ মিশনের নাম ছিল ক্রু-১১। আর স্পেসএক্সের যে মহাকাশযান করে নভোচারীদের আইএসএসে পাঠানো হয়েছিল সেটার নাম ছিল ‘ক্রু ড্রাগন’। নাসার এই মিশনের জন্য ক্রু ড্রাগনের ক্যাপসুলটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ইন্ডেভার’। নভোচারীদের ফিরে আসার শেষ মুহূর্ত নাসা-স্পেসএক্স নিজেদের ওয়েবসাইটে সরাসরি সম্প্রচার করেছে।
অবতরণের কিছুক্ষণের মধ্যে ক্যাপসুলের আশপাশে কয়েকটি ডলফিনকে সাঁতার কাটতে দেখা গেছে। তখন ক্যাপসুলটি পানিতে ধীরে ধীরে সোজা অবস্থায় ভাসছিল।
চার নভোচারীর মধ্যে দুজন যুক্তরাষ্ট্রের। তাঁরা হলেন ইন্ডেভার ক্যাপসুলের ৩৮ বছর বয়সী কমান্ডার জিনা কার্ডম্যান এবং ৫৮ বছর বয়সী মাইক ফিঙ্কে। বাকি দুজন হলেন জাপানের ৫৫ বছর বয়সী কিমিয়া ইউই ও ৩৯ বছর বয়সী রাশিয়ার ওলেগ প্লাটোনভ।
সান দিয়েগো থেকে ফেরার পথে রেডিও ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছে স্পেসএক্সের ফ্লাইট-কন্ট্রোল কেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলছিলেন কার্ডম্যান। এ সময় তিনি বলেন, ‘বাড়ি ফিরে ভালো লাগছে।’
এই চার নভোচারী গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মহাকাশযান উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে আইএসএসে পৌঁছান। গত বুধবার বিকেলে তাঁরা পৃথিবীদের দিকে যাত্রা শুরু করেন। তাঁরা আইএসএসে ১৬৭ দিন ছিলেন।
নাসা-স্পেসএক্সের প্রতিটি মিশন আইএসএসে সাধারণত ছয় মাস অবস্থান করে। পরবর্তী মিশন আইএসএসে পৌঁছানোর পর আগের মিশনের নভোচারীরা পৃথিবীতে ফিরে আসেন। সেই হিসাবে মাসখানেক আগেই ক্রু-১১-এর মিশন শেষ হলো।
আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে ক্রু-১২ মিশনে আরও চারজন নভোচারীর আইএসএসে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে মহাকাশ স্টেশনে নাসার ক্রিস্টোফার উইলিয়ামস এবং রাশিয়ার দুজন নভোচারী রয়েছেন।
ক্রু-১১ মিশনের নভোচারীরা ৭ জানুয়ারি কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেন। পরের দিন ৮ জানুয়ারি নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান ক্রু-১১ মিশনের চার নভোচারীকে আগেভাগে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেন। তখন তিনি বলেছিলেন, গুরুতর অসুস্থতার কারণে একজন নভোচারীকে পৃথিবীতে এনে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন। বুধবার দিবাগত রাতে ক্রু-১১ মিশনের ক্যাপসুলটি অবতরণের সময় তিনি মিশন কন্ট্রোল কক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
গোপনীয়তা রক্ষার্থে নাসার কর্মকর্তারা অসুস্থ নভোচারীর পরিচয় বা তাঁর অসুস্থতার ধরন প্রকাশ করেননি। নাসার প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা জেমস পলক জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী নভোচারীর স্বাস্থ্যগত সমস্যা কাজ-সংক্রান্ত কোনো আঘাতের কারণে হয়নি।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ২০০০ সাল থেকে ইউরোপ, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যৌথভাবে গবেষণা ও অভিযান পরিচালনা করে আসছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থিত এ স্টেশন আরও নিবিড় মহাকাশ গবেষণার জন্য পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করে আসছে। এসব গবেষণা ভবিষ্যতে মানুষকে চাঁদ এবং মঙ্গলে পাঠানোর মিশনে সহযোগিতা করছে।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ২০৩০ সালের পরে বন্ধ করে দেওয়া হবে। তখন এটি কক্ষপথ থেকে ধীরে ধীরে নিচে নেমে প্রশান্ত মহাসাগরের দূরবর্তী একটি অঞ্চলের ওপরের বায়ুমণ্ডলে ভেঙে পড়বে। অঞ্চলটির নাম ‘পয়েন্ট নেমো’, যা মহাকাশযানের কবরস্থান নামে পরিচিত।