এআই ব্যবহারে কি একঘেয়ে হয়ে উঠছে মানুষ, ঝুঁকছে পুরোনো ধাঁচের জীবনযাত্রায়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রসারের এ যুগে মানুষের জীবন এআইচালিত নানা যন্ত্র আর চ্যাটবটে ভরে গেছে। এখন মানুষের হয়ে অনেক কাজ আর চিন্তাভাবনা এআই করে দিচ্ছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ধারার এ জীবন আবার অনেকের মধ্যে একঘেয়েমিও তৈরি করছে। এ ধরনের মানুষের কারও কারও মধ্যে ডিজিটাল দুনিয়া থেকে বের হয়ে পুরোনো জীবনধারার নানা অনুষঙ্গ ব্যবহারের প্রতি ঝোঁক দেখা যাচ্ছে।
প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কম থাকা পুরোনো ধাঁচের জীবনযাপনের এ ধারাকে বলা হয় ‘অ্যানালগ লাইফস্টাইল’। ডিজিটাল দুনিয়ায় অল্প সময়ে সমস্যার সমাধান করে ফেলার প্রবণতা থেকে এ ধারাটা আলাদা। তুলনামূলক ধীরগতির জীবনযাপন, দৈনন্দিন কাজ নিজের হাতে করা এবং বিনোদনের জন্য বাস্তবধর্মী ও সাধারণ উপায় খোঁজাটাই ‘অ্যানালগ লাইফস্টাইল’–এর মূলকথা।
মানুষ কী হারে ‘অ্যানালগ লাইফস্টাইল’–এর দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তা সুনির্দিষ্ট করে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে কম্পিউটার, মোবাইলসহ অনলাইন দুনিয়ায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামের স্ক্রিন থেকে বিরতি নিয়ে মানুষ যে পুরোনো ধাঁচের শখগুলোর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে, তা টের পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘শিল্পকলা ও হস্তশিল্পবিষয়ক’ পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান মাইকেলস বলেছে, গত ছয় মাসে তাদের ওয়েবসাইটে ‘অ্যানালগ’ ধারার শখের সঙ্গে সম্পর্কিত উপকরণগুলো খোঁজার হার ১৩৬ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৫ সালে তাদের গাইডেড ক্রাফট কিটের (হস্তশিল্প পণ্য তৈরির সরঞ্জাম) বিক্রি বেড়েছে ৮৬ শতাংশ। চলতি বছরে তা আরও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে তারা আশা করছে।
‘দাদি–নানি যুগের শখ’ হিসেবে পরিচিত বুনন বা হাতে সেলাইয়ের উপকরণগুলোর খোঁজ ১ হাজার ২০০ শতাংশ বেড়েছে।
মাইকেলস কোম্পানির প্রধান মার্চেন্ডাইজিং কর্মকর্তা স্টেসি শিভেলি সিএনএনকে বলেছেন, তাঁর কোম্পানি সেলাইসামগ্রী বিক্রির জন্য নির্ধারিত জায়গার পরিমাণ আরও বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে।
শিভেলি বলেন, ডিজিটাল দুনিয়ায় ক্রমাগত স্ক্রলিং থেকে বিরতি নেওয়া এবং মানসিক স্বস্তির জন্য হস্ত ও কারুশিল্পের প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পরে এ ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
শিভেলি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি বর্তমানে একটি বড় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন।’
মাইকেলস কোম্পানির প্রধান মার্চেন্ডাইজিং কর্মকর্তা স্টেসি শিভেলি বলেছেন, ডিজিটাল দুনিয়ায় ক্রমাগত স্ক্রলিং থেকে বিরতি নেওয়া এবং মানসিক স্বস্তির জন্য হস্ত ও কারুশিল্পের প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পরে এ ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সিএনএনের জন্য এ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন রামিশাহ মারুফ। তিনি সিএনএনের ব্যবসা ও বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিবেদক। রামিশাহ মারুফ লিখেছেন, স্ক্রলিং থেকে মানুষের বিরতি নেওয়ার প্রবণতা দেখে তিনিও এমনটা পরীক্ষা করে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। মারুফের জন্য স্ক্রলিং থেকে বিরতি নেওয়ার অর্থ হচ্ছে তিনটি আইফোন, একটি ম্যাকবুক, দুটি বড় ডেস্কটপ মনিটর, একটি কিন্ডল এবং একটি অ্যালেক্সার ব্যবহার বন্ধ রাখা।
প্রতিবেদনে মারুফ লিখেছেন, ‘৪৮ ঘণ্টার জন্য আমি ১৯৯০-এর দশকের মতো করে জীবনযাপন করেছি। মাত্র দুই দিন অনলাইন থেকে দূরে থাকার বিষয়টাকে শুনতে সহজ মনে হয়। অধিকাংশ মানুষের জন্য হয়তো তা সত্যিই সহজ। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো তিনটি আইফোন, একটি ম্যাকবুক, দুটি বড় ডেস্কটপ মনিটর, একটি কিন্ডল এবং একটি অ্যালেক্সার ব্যবহার বন্ধ রাখা এবং সব ডিভাইসে ঢুঁ মারার মতো জেন–জি প্রবণতা থেকে বিরতি দেওয়া।’
মারুফ আরও লিখেছেন, এই যাত্রা শুরু করার আগে তিনি অনুপ্রেরণার জন্য সাধারণ অ্যানালগ জীবনযাপনকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তেমনই একজন হলেন শঘনেসি বার্কার। ২৫ বছর বয়সী এ তরুণ কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বাসিন্দা। বার্কারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাঁকে ল্যান্ডফোন নম্বরে ফোন করতে হবে। তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না।
২০১০-এর দশকে অনেক কম বয়সীদের মতো বার্কারও ব্রিটিশ বয় ব্যান্ড ওয়ান ডিরেকশনের ভক্ত হিসেবে ‘স্টান টুইটার’ নামের অনলাইন কমিউনিটিতে যুক্ত হন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেটের প্রতি তাঁর আগ্রহ কমে যায়।
বার্কারের মতে, ‘ইন্টারনেটে সবকিছু এখন মুনাফা লাভের জন্য করা হয়। কোনো কিছু এখন আর নিতান্তই আনন্দের জন্য নয়।’
বার্কারের জন্য অ্যানালগ জীবনধারা শুরু করাটা কঠিন ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমি গোড়া থেকে এআইবিরোধী।’
প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কম থাকা পুরোনো ধাঁচের জীবনযাপনের এ ধারাকে বলা হয় ‘অ্যানালগ লাইফস্টাইল’। ডিজিটাল দুনিয়ায় অল্প সময়ে সমস্যার সমাধান করে ফেলার প্রবণতা থেকে এ ধারাটা আলাদা। তুলনামূলক ধীরগতির জীবনযাপন, দৈনন্দিন কাজ নিজের হাতে করা এবং বিনোদনের জন্য বাস্তবধর্মী ও সাধারণ উপায় খোঁজাটাই ‘অ্যানালগ লাইফস্টাইল’–এর মূলকথা।
বার্কার ছোটবেলায় রেডিও এবং ভিনাইল রেকর্ড শুনে বড় হয়েছেন এবং তাঁর কাছে ক্যাসেট, ডিভিডি, ভিএইচএস ও রেকর্ডের বিশাল সংগ্রহ আছে। তিনি প্রযুক্তি ছাড়াই ক্রাফট নাইট এবং ওয়াইন নাইট আয়োজন করেন, নোট লেখেন। কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তিনি সীমা বজায় রাখেন।
বার্কার বন্ধুদের বলে রেখেছেন, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে ল্যান্ডফোনে ফোন দিতে বা চিঠি লিখতে।
তবে বার্কারের মতো মানুষের জন্যও পুরোপুরি অনলাইন থেকে দূরে থাকাটা ক্রমেই কঠিন হয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, পুরোনো ঐতিহ্যে তৈরি তাঁর শৈল্পিক দোকান বা ‘হাতে লেখা চিঠির ক্লাব’-এর পক্ষে প্রচার চালানোর একমাত্র উপায় হলো ইন্টারনেট।
বার্কার নিজেও স্বীকার করেছেন, তাঁর কাজের ধরনটা পারস্পরিক সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে। একদিকে তিনি ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখছেন। আবার সেটা সম্পর্কে জানাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকটকেরও আশ্রয় নিচ্ছেন।
অ্যানালগ জীবন কেমন
অ্যানালগ জীবনধারা বেছে নেওয়া মানুষেরা স্ক্রলিং আর এআই দিয়ে বানানো একঘেয়ে কনটেন্টে ক্লান্ত। অনেকেই বিরক্ত।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রিভারসাইডের এআই বিষয় গবেষক ও সহকারী অধ্যাপক অ্যাভরিয়েল এপস বলেন, ‘এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট দেখা যেমন ক্লান্তিকর, তেমনি এগুলো এতটাই একঘেয়ে আর মৌলিকতা বিবর্জিত যে আরও বিরক্ত লাগে।’
‘অ্যানালগ জীবনযাপন মানে প্রযুক্তির ব্যবহার পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া নয়। অ্যানালগ জীবনযাপনকারীরা বলেন না, তাঁরা প্রযুক্তিবিরোধী। অনেকে অ্যানালগ জীবনধারাকে আংশিকভাবে গ্রহণ করেছেন।
যেমন এআইচালিত মাধ্যমের ব্যবহার বাদ দিয়ে আইপড ব্যবহার করা, একই ভঙ্গিতে অসংখ্য ছবি না তুলে ধীরে ধীরে একটি ফিল্ম ক্যামেরায় ছবি তোলা। এমনকি সাধারণ একটি অ্যালার্ম ঘড়ি কিনে নেওয়াটাকেও অনেকের কাছে মুক্তির মতো লাগে।
এপস বলেন, ‘অ্যানালগ জীবনধারায় রূপান্তরের অর্থই যে নিজেকে ইন্টারনেটের তথ্য থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে, তা নয়। বরং এর অর্থ হলো, ইন্টারনেটকে আমার সম্পর্কে তথ্য নেওয়া থেকে দূরে রাখা।’
এপস সম্প্রতি গুগল স্যুট ব্যবহার করা বন্ধ করেছেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো তিনি স্ক্রিন ছাড়া কাটান।
সিএনএনের প্রতিবেদক রামিশাহ মারুফ দুদিন ধরে তাঁর স্ক্রিনমুক্ত জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লিখেছেন, ‘অফলাইনে থাকার প্রথম দিনের সকালটা আমার জন্য বেশ সহজ ছিল। সূর্যের আলোয় স্বাভাবিকভাবেই ঘুম ভাঙল। মনে হলো যেন আমি কোনো লাইফস্টাইল ইনফ্লুয়েন্সারের অভিনয় করছি। আমি ডায়েরি লিখলাম, ‘উদারিং হাইটস’-এর একটি পুরোনো কপি খুলে পড়লাম। আর অর্ধেক সময়ই সাজলাম। পুরোনো আইপড বা ভিএইচএস প্লেয়ার খুঁজে বের করার সময় পাইনি, তাই দিন কাটাতে আমাকে ভরসা করতে হলো হস্তশিল্প এবং বই পড়ার ওপর।’
দুই দিনের চ্যালেঞ্জের সময় মারুফ ব্রুকলিনের একটি লাইব্রেরিতে সাপ্তাহিক সেলাই কাজের আসরে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে নানা বয়সের নারীরা স্ক্রিন ছাড়াই সেলাইয়ের কৌশল ও রঙের আইডিয়া ভাগাভাগি করছিলেন। সেখানে প্রায় ২০ জন উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সবাই বলছিলেন, হাতে সেলাইয়ের কাজ তাঁদের মানসিক চাপ কমানোর উপায়।
মারুফের নিজের কাছেও মনে হলো, তাঁর হাতে অনেক ফাঁকা সময় আছে। তিনি শেষমেশ ‘উদারিং হাইটস’ পড়া শেষ করতে পারলেন, তাঁর ৮ বছরের চাচাতো বোনকে একটি পোস্টকার্ড পাঠালেন।
মারুফের ভাষায়, ‘আমার মনে হলো, কাজ আর উজ্জ্বল নীল স্ক্রিনের বাইরেও আমি কিছু করতে পেরেছি।’