ইরান যুদ্ধ প্রায় শেষ, কয়েক সপ্তাহে আরও কঠোর হামলা: জাতির উদ্দেশে ভাষণে ট্রাম্প
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধাভিযান প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। গতকাল বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ কথা বলেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, ওয়াশিংটন নিজের সামরিক লক্ষ্য পূরণের পথে এগিয়ে যেতে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ ইরানের ওপর কঠোর আঘাত হানবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এ প্রথম জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন ট্রাম্প। ভাষণে ট্রাম্প যুদ্ধক্লান্ত মার্কিন নাগরিকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করতে গিয়ে বলেন, এই সামরিক অভিযান সার্থক।
হোয়াইট হাউস থেকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, তার জন্য ধন্যবাদ। আজ রাতে আমি বলতে পারি, আমরা শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক লক্ষ্য পূরণ করার পথে—খুবই শিগগির।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘এ যুদ্ধের মূল কৌশলগত লক্ষ্যগুলো প্রায় পূরণের পথে। তবে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি।’
স্থানীয় সময় রাত ৯টায় দেওয়া ওই ভাষণে ট্রাম্প ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই, কোনো পরিস্থিতিতেই তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হতে বা ব্যর্থ হতে দেবে না।
ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বলেন, ইরানের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ থাকতে পারে। নতুন নেতৃত্বকে তিনি পূর্ববর্তী নেতৃত্বের তুলনায় ‘কম কট্টর এবং অনেক বেশি যুক্তিসংগত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে, তিনি সংঘাত শেষ করার জন্য চুক্তি করার চেষ্টা করছেন।
তবে ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেন, যদি কোনো চুক্তি না হয়, ওয়াশিংটনের দৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর ওপর আছে, যার মধ্যে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোও রয়েছে।
ট্রাম্পের এই ভাষণ জ্বালানির বাজারকে শান্ত করতে খুব একটা কাজে আসেনি, বিশ্ববাজারে আজ বৃহস্পতিবারও তেলের দাম বেড়েছে। ট্রাম্প অন্যান্য দেশকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রবাহিত হয়। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জলপথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি অস্থির হয়ে উঠেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বুধবার প্রতিজ্ঞা করেছে, তারা দেশের ‘শত্রুদের’ জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখবে।
অযৌক্তিক দাবি
ইরান বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছে। সংঘাত শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব দাবি, সেগুলোকে তেহরান ‘অত্যধিক ও অযৌক্তিক’ বলে বর্ণনা করেছে।
সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাকায়ির বরাত দিয়ে বলেছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান বার্তা হাতে পেয়েছে। মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে পাকিস্তানও রয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি আলোচনা হয়নি।
ট্রাম্প বুধবার দাবি করেছিলেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতি চেয়েছেন, তবে তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে বলেছেন, আগে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে। তিনি তাঁর ভাষণে এ প্রসঙ্গে বলেন, সংঘাত শেষ হলে ‘স্বাভাবিকভাবেই’ এটা ঘটবে।
ট্রাম্প এমন এক সময়ে এ ভাষণ দিলেন, যখন যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে, অর্থনৈতিক উদ্বেগ বাড়ছে এবং কূটনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে এ যুদ্ধ শুরু হয়।
ট্রাম্পের ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মার্কিন জনগণের কাছে প্রশ্ন করেছিলেন, এই সংঘাত সত্যিই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নিশ্চিত করছে কি না। তিনি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও ইসরায়েলের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খোলাচিঠিতে পেজেশকিয়ান আরও বলেন, এমনকি তাঁর দেশ বারবার বিদেশি হস্তক্ষেপ ও চাপের মুখে থাকলেও সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা ইরানের শত্রু নয়।