ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের ভুলের মাশুল গুনছে যুক্তরাষ্ট্র, কৌশলগত হার মানছেন মার্কিনরা

প্যারিস অরলি বিমানবন্দরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্যারিস, ফ্রান্স, ১৭ জুন ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর পরিচালিত প্রথম বড় জনমত জরিপে একটি তথ্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য সুসংবাদ বলে মনে হতে পারে। সেটি হলো, দেশটির সিংহভাগ নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্পের উচিত আরও ছাড়ের জন্য চাপ না দিয়ে যুদ্ধ শেষ করা।

তবে মার্কিনরা এ চুক্তিকে পছন্দ করছেন বলে এমনটা ভাবছেন না। মূলত তাঁরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে একটি চরম বিপর্যয় বলে মনে করেন এবং যেকোনো মূল্যে এর অবসান চান।

‘সিবিএস নিউজ-ইউগভ’-এর নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিনরা এ যুদ্ধের শেষ দেখার একটি প্রাথমিক আভাস পেলেও, যুদ্ধ নিয়ে তাঁদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিন্দুমাত্র বদলায়নি।

ট্রাম্প প্রশাসন যখন এ চুক্তির নতুন ধাপে প্রবেশ করছে, তখন এর রাজনৈতিক অবস্থান এবং পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর এটির কী প্রভাব পড়তে পারে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মার্কিনরা মনে করছেন, এটি একটি খারাপ চুক্তি

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৭৮ শতাংশ মার্কিন এখন যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে মাত্র ২২ শতাংশ নাগরিক আরও অপেক্ষা করার পক্ষে, যাতে ইরান বেশি ছাড় দিতে বাধ্য হয়।

গত রোববার ট্রাম্পের অন্তত একজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা এ ফলাফলে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে মার্কিন জনগণ ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পক্ষেই আছেন। তবে জরিপের বাকি অংশগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে, তাঁর এ দাবি মোটেও সত্য নয়।

চুক্তিটির মূল্যায়নের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মাত্র ২২ শতাংশ মার্কিন বলেন, এটি ইরানের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশি লাভজনক হয়েছে। বিপরীতে এর চেয়ে ঢের বেশি ৩৭ শতাংশ মানুষের মত, চুক্তিটি ইরানের জন্য বেশি সুবিধাজনক হয়েছে। বাকি ৪১ শতাংশ মনে করেন, চুক্তিটি উভয় পক্ষের জন্যই সমান হয়েছে।

ট্রাম্প বারবার দাবি করে এসেছেন যে, তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। তবে জরিপ বলছে, ৬৯ শতাংশ মার্কিন এবং খোদ রিপাবলিকান দলের ৪৫ শতাংশ কর্মী মনে করেন, যুদ্ধ শেষ করার জন্য এ চুক্তি চূড়ান্ত করা হলেও তা ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থামাতে পারবে না।

এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হয়েছে বলে যাঁরা মনে করেন, তাঁদের মধ্যে রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকের সংখ্যা মাত্র ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ ট্রাম্পের নিজ দলের প্রতি ১০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন মনে করেন, তাঁর প্রশাসন এই আলোচনায় জয়ী হয়েছে। পাশাপাশি কৌশলগত দিক থেকে এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়নি বলে মনে করেন ৪৫ শতাংশ মার্কিন। বিপরীতে এটিকে সফল ভাবছেন মাত্র ২৯ শতাংশ নাগরিক।

কৌশলগত পরাজয় মেনে নিচ্ছেন মার্কিনরা

জরিপের এ শেষ তথ্য (অর্থাৎ ৪৫ শতাংশ এ যুদ্ধকে ব্যর্থ বলে মনে করছেন) সম্ভবত মার্কিনদের চোখে চুক্তিটি কত বড় কৌশলগত পরাজয়, তা পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে পারছে না।

সহজ কথায়, মার্কিনরা যে ট্রাম্পের এ চুক্তিকে একটি কৌশলগত পরাজয় হিসেবে দেখছেন, তার সবচেয়ে বড় ও অকাট্য প্রমাণ লুকিয়ে আছে পারমাণবিক ইস্যু–সংক্রান্ত জরিপের ফলাফলের মধ্যে।

ভার্সাই প্রাসাদে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ওই মুহূর্তের ভিডিও পোস্ট করেন। ১৭ জুন, ২০২৬
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। কিন্তু তাঁর এ প্রধান লক্ষ্যেই মানুষ সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা দেখতে পাচ্ছে। জরিপ বলছে, ৬৯ শতাংশ মার্কিন এবং খোদ রিপাবলিকান দলের ৪৫ শতাংশ কর্মী মনে করেন, যুদ্ধ শেষ করার জন্য এ চুক্তি চূড়ান্ত করা হলেও তা ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থামাতে পারবে না।

গত জুনের মাঝামাঝি যখন এই চুক্তির প্রাথমিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চলছিল, তখন ‘ফক্স নিউজ’-এর করা একটি জরিপেও ঠিক একই চিত্র দেখা গিয়েছিল।

ওই জরিপেও নিবন্ধিত ভোটারদের ৬৪ শতাংশ বলেছিলেন, এ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখা যাবে না। বিপরীতে ৩৫ শতাংশ ভোটার মনে করেছিলেন এটি সম্ভব।

প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জনেরও বেশি মার্কিন মনে করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগের মতোই শক্তিশালী আছে (৩৮ শতাংশ) বা আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে (২৫ শতাংশ)।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ চুক্তির অনেক খুঁটিনাটি বিবরণ পরবর্তী আলোচনার জন্য জমা রাখা হয়েছে। তাই পারমাণবিক ইস্যুর চূড়ান্ত সুরাহা করতে এখনো অনেক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে হবে।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে তাদের আগের কিছু লক্ষ্য থেকে পিছু হটছে বলে মনে হচ্ছে। আর জরিপের এ ফলাফলগুলো মার্কিন জনগণের মধ্যে জেঁকে বসা চরম হতাশাকেই স্পষ্ট করে তুলছে।

নতুন সিবিএস নিউজের জরিপে আরও কিছু তথ্য উঠে এসেছে। যেমন ৬৮ শতাংশ মার্কিন মনে করেন, চুক্তিটি চূড়ান্ত হলেও ইরান অন্য দেশগুলোকে হুমকি দেওয়া বন্ধ করবে না। এমনকি রিপাবলিকানদের প্রায় অর্ধেক (৪৮ শতাংশ) এ মতের সঙ্গে একমত।

এ ছাড়া ৭৯ শতাংশ মানুষের মতে, এ চুক্তি ইরানের নেতাদের মোটেও যুক্তরাষ্ট্রপন্থী বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারেনি। আবার, ৭৪ শতাংশ মনে করেন, এই চুক্তি ইরানের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারেনি—অথচ চলতি বছরের শুরুর দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

ইরান যুদ্ধকে উল্টো ক্ষতিকর মনে করছেন মার্কিনরা

ইরান যুদ্ধ নিয়ে হওয়া জনমত জরিপগুলোর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ও ধারাবাহিক দিক হলো, মার্কিনরা এ যুদ্ধকে শুধু একটি ব্যর্থতাই মনে করছেন না, বরং এটি হিতে বিপরীত বা উল্টো ক্ষতিকর হয়েছে বলে বিশ্বাস করেন। বর্তমানেও এই মনোভাব বজায় রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, এ যুদ্ধ ইরানের সামরিক শক্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু মাত্র ৩৭ শতাংশ মার্কিন মনে করেন যে যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে ইরান এখন দুর্বল হয়েছে।

এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হয়েছে বলে যাঁরা মনে করেন, তাঁদের মধ্যে রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকের সংখ্যা মাত্র ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ ট্রাম্পের নিজ দলের প্রতি ১০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন মনে করেন, তাঁর প্রশাসন এই আলোচনায় জয়ী হয়েছে। পাশাপাশি কৌশলগত দিক থেকে এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়নি বলে মনে করেন ৪৫ শতাংশ মার্কিন। বিপরীতে এটিকে সফল ভাবছেন মাত্র ২৯ শতাংশ নাগরিক।

এটি সত্য যে ইরান এই যুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তারা নিজেদের বিশাল সক্ষমতার প্রমাণও দিয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে রাখার যে ক্ষমতা তারা দেখিয়েছে, তা তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। আর এ কারণেই মার্কিনরা মনে করছেন, আগামী মাস ও বছরগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধের মাশুল গুনে যেতে হবে।

জরিপে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ বা ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, এ যুদ্ধ আসলে সমস্যার সমাধান করার চেয়ে নতুন সমস্যা বেশি তৈরি করেছে। বিপরীতে মাত্র ২১ শতাংশ মনে করেন, এটি সমস্যার সমাধান করেছে। অর্থাৎ যুদ্ধকে ক্ষতিকর ভাবা মানুষের সংখ্যা সমাধান পাওয়া মানুষের প্রায় তিন গুণ।

আরও পড়ুন
ওমানের মুসান্দাম থেকে দেখা হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজ। ১৫ জুন, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

অপ্রস্তুত ছিলেন ট্রাম্প

যুদ্ধের প্রভাবের কথা যখন আসে, তখন মার্কিনরা মনে করছেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে কিসের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছেন, তা তিনি নিজেই বুঝতে পারেননি।

এ যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে পেরেছিল কি না—জরিপে এমন একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল। দেখা গেছে, পুরোপুরি ৬৪ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, এ যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে। এ মতের পক্ষে রিপাবলিকান দলের ৫১ শতাংশ কর্মীও সায় দিয়েছেন।

অবশ্য এ ধারণার সপক্ষে ট্রাম্পের নিজস্ব প্রকাশ্য মন্তব্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকেও অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। সিএনএন গত মার্চে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ইরান যে হরমুজ প্রণালি বন্ধের চেষ্টা করার মতো সাহস দেখাবে, ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে সেই ইচ্ছা ও সক্ষমতা খাটো করে দেখেছিল।

আরও পড়ুন

যুদ্ধ শেষ করতে ব্যাকুল মার্কিনরা, একই দশা ট্রাম্পেরও!

এ জরিপের শেষ বড় শিক্ষা হলো, মার্কিনরা এখন একদিক থেকে ট্রাম্পের সঙ্গে একই কাতারে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁরা শুধু এই পরিস্থিতির দ্রুত অবসান চান এবং তাঁরা মনে করছেন ট্রাম্পও এখন সেটাই চাইছেন।

প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জনেরও বেশি মার্কিন মনে করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগের মতোই শক্তিশালী আছে (৩৮ শতাংশ) বা আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে (২৫ শতাংশ)।

ডোনাল্ড ট্রাম্প, মোজতবা খামেনি ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
কোলাজ ছবি

গত জুনের মাঝামাঝি ফক্স নিউজের জরিপে দেখা গিয়েছিল, ৭০ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার এ যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদে টেনে নেওয়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এ ছাড়া ৮৭ শতাংশ মানুষ মনে করেছিলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

আর এ জনমতই সম্ভবত ব্যাখ্যা করে যে কেন মার্কিনরা একটি ‘ত্রুটিপূর্ণ বা আশানুরূপ নয়’ এমন একটি চুক্তিও মেনে নিতে রাজি হচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে বলেছিল, এ যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। কিন্তু এখন তা টেনেহিঁচড়ে চলছে প্রায় চার মাস ধরে।

এ দীর্ঘ সময়ে মার্কিনরা তেমন কোনো বড় সাফল্য বা অর্জন দেখতে পাননি। যেহেতু, শুরুতেই এ যুদ্ধে জড়ানোর পেছনে তাঁরা তেমন কোনো জোরালো কারণ খুঁজে পাননি, তাই এখন যে তাঁরা এ ঝামেলা থেকে দ্রুত পিছু হটতে চাইবেন, সেটাই স্বাভাবিক। আর সবচেয়ে বড় সত্যি হলো, মার্কিনরা মনে করছেন—এখন ট্রাম্প নিজেও ঠিক এ কাজই করছেন।

সিবিএসের জরিপে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন তার সব লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছে বলে এ চুক্তিতে পৌঁছাচ্ছে, নাকি তারা শুধু ‘এই সংঘাতের অবসান চায়’ বলে চুক্তি করছে? উত্তরে দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আসলে সব লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি, তারা শুধু যেকোনো মূল্যে এই ঝামেলার দ্রুত সমাপ্তি টানতে চাইছে।

আরও পড়ুন