লেবাননে গাজার মতো ‘ইয়েলো লাইন’ তৈরির কথা জানাল ইসরায়েল

লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে ইসরায়েলি হামলার পর গাঢ় কালো ধোঁয়া উঠছে। ১৬ এপ্রিল ২০২৬।ছবি: রয়টার্স

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার আদলে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ‘ইয়েলো লাইন’ নামে একটি সীমারেখা টেনে দিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী।

লেবাননে এ ধরনের সীমারেখা টানার ঘটনা এটিই প্রথম। গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েল-লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এ-সংক্রান্ত ঘোষণা আসে।

গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বলেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণ লেবাননে ‘ইয়েলো লাইন’-এর দক্ষিণে অবস্থানরত তাদের সেনারা এমন কিছু যোদ্ধাকে শনাক্ত করেছেন, যাঁরা যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে উত্তর দিক থেকে এই সীমারেখার দিকে এগিয়ে আসছিলেন। তাঁরা তাৎক্ষণিক হুমকির সৃষ্টি করেছিলেন।

গত বছরের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সেখানে ‘ইয়েলো লাইন’ তৈরি করে ইসরায়েল। এই সীমারেখা গাজাকে দুটি পৃথক অঞ্চলে ভাগ করে দিয়েছে। পূর্বাঞ্চল ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। আর পশ্চিমাঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের চলাচলে তুলনামূলকভাবে কম বিধিনিষেধ রয়েছে।

ইসরায়েলি সেনারা নিয়মিত এই সীমারেখার কাছে আসা যেকোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। পাশাপাশি নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় শত শত বাড়িঘর ধ্বংস করেছেন তাঁরা।

গাজায় কথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত সেখানে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৭৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই হাজারের বেশি মানুষ।

যুদ্ধবিরতি চলাকালেও দক্ষিণ লেবাননে হামলা থামায়নি ইসরায়েল। গতকাল দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বেইত লেইফ, কান্তারা ও তুলিন শহরে কামানের গোলা নিক্ষেপ করেন ইসরায়েলি সেনারা। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর ধ্বংসের কাজও অব্যাহত রয়েছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক নূর ওদেহ বলেন, লেবাননে ‘ইয়েলো লাইন’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইসরায়েল ধীরে ধীরে দক্ষিণ লেবাননকে গাজার মতো পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

নূর ওদেহ বলেন, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ তাঁর দেশের সেনাবাহিনীকে লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো গাজার বেইত হানুন ও রাফার মতো করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বেইত হানুন ও রাফায় এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ফলে লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর পরিণতি কী হতে পারে, তা স্পষ্ট।

নূর ওদেহ আরও বলেন, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এখনই দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা ইসরায়েলের না থাকলেও গ্রাম ধ্বংসের কাজ অব্যাহত আছে। শিয়া–অধ্যুষিত গ্রামগুলোকে হিজবুল্লাহর অবকাঠামোর সমতুল্য বলে বিবেচনা করছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ঠিক যেভাবে গাজায় পুরো ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে হামাসের সঙ্গে সমার্থক হিসেবে দেখা হয়েছিল।

যুদ্ধবিরতিতেও হামলা অব্যাহত

যুদ্ধবিরতি চলাকালেও দক্ষিণ লেবাননে হামলা থামায়নি ইসরায়েল। গতকাল দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বেইত লেইফ, কান্তারা ও তুলিন শহরে কামানের গোলা নিক্ষেপ করেন ইসরায়েলি সেনারা। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর ধ্বংসের কাজও অব্যাহত রয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের অবস্থানের কাছে যোদ্ধারা এগিয়ে আসায় তারা এই হামলা চালিয়েছে। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে এবং তাৎক্ষণিক হুমকি দূর করতে নেওয়া পদক্ষেপ যুদ্ধবিরতির আওতার বাইরে।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাড়ির সামনে বসে আছেন এক ব্যক্তি। আল-মাজরা, বৈরুত, লেবানন। ১৩ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

‘উভয় পক্ষকেই যুদ্ধবিরতি মানতে হবে’

গতকাল রাতে হিজবুল্লাহর প্রধান নাঈম কাশেম বলেছেন, চলমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি তখনই টিকবে, যখন উভয় পক্ষ তা মেনে চলবে।

টেলিভিশনে দেওয়া বিবৃতিতে নাঈম কাশেম বলেন, যুদ্ধবিরতির অর্থ হলো সব ধরনের সংঘর্ষের পূর্ণ অবসান। তাঁরা এই শত্রুকে (ইসরায়েল) বিশ্বাস করেন না। তাই তাঁদের প্রতিরোধ যোদ্ধারা মাঠে থাকবেন। আঙুল ট্রিগারে রেখে তাঁরা যেকোনো লঙ্ঘনের জবাব দেবেন।

আরও পড়ুন

হিজবুল্লাহর প্রধান বলেন, যুদ্ধবিরতি একতরফা হতে পারে না। এটি অবশ্যই দুই পক্ষকে মানতে হবে। একই সঙ্গে তিনি লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানান।

যুদ্ধবিরতির অর্থ হলো, সব ধরনের সংঘর্ষের পূর্ণ অবসান। তাঁরা এই শত্রুকে (ইসরায়েল) বিশ্বাস করেন না। তাই তাঁদের প্রতিরোধ যোদ্ধারা মাঠে থাকবেন। আঙুল ট্রিগারে রেখে তাঁরা যেকোনো লঙ্ঘনের জবাব দেবেন।
নাঈম কাশেম, হিজবুল্লাহর প্রধান

নাঈম কাশেম জানান, পরবর্তী ধাপে বন্দীদের মুক্তিসহ সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের ঘরে ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এরপর আরব সহায়তায় বড় পরিসরে পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে।

হিজবুল্লাহর প্রধান আরও বলেন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন এড়াতে তাঁর সংগঠন লেবানন সরকারের সঙ্গে নতুনভাবে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রস্তুত।

আরও পড়ুন

ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে গত বৃহস্পতিবারের যুদ্ধবিরতি মূলত ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বরের চুক্তিরই ধারাবাহিকতা।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সেই চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েল ১০ হাজারের বেশিবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। এতে লেবাননে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

আরও পড়ুন