বিতর্ক নিয়ে ৫ দিনের মধ্যে যেতে হলো প্রেস সেক্রেটারিকে, এখন কী করবেন ট্রাম্প

হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে ১৩ অক্টোবর কেটি জাকারাইয়া প্রথমবারের মতো সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনেছবি: রয়টার্স

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব এমনিতেই কঠিন, এমনকি পরিস্থিতি সবচেয়ে অনুকূল থাকলেও। আর কেটি জাকারাইয়ার জন্য পরিস্থিতি মোটেও অনুকূল ছিল না।

কেটি জাকারাইয়া এমন সময়ে প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে হোয়াইট হাউসে নিয়োগ পেয়েছিলেন, যখন আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন।

জনমত জরিপ বলছে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান দলের জন্য কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

অথচ নিয়োগের মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই কেটি জাকারাইয়াকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে ছিল মাত্র ১৪ মিনিটের একটি বিপর্যয়কর সংবাদ সম্মেলন। এরপর গণমাধ্যমে তাঁর একের পর এক নিষ্প্রভ সাক্ষাৎকার আর নিজের ‘অ্যাটর্নি’ পরিচয় নিয়ে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক।

কেটি ক্যালিফোর্নিয়ায় বার পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি। এমনকি অ্যাটর্নি পরিচয় ব্যবহার না করার পরামর্শ পাওয়ার কথাও তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। অথচ গত দুই বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা অন্তত ১৫টি পোস্টে তাঁকে ‘অ্যাটর্নি’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে তাঁর কর্মজীবন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

তুমুল বিতর্কের জেরে গতকাল শুক্রবারই তাঁর ওপর খড়্গ নেমে আসে। হোয়াইট হাউসে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে ট্রাম্প নিজেই ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বিষয়টি জানান। তিনি দিনের শুরুতেই কেটি জাকারাইয়ার সঙ্গে তাঁর যে কথোপকথন হয়েছিল, তা তুলে ধরছিলেন।

ট্রাম্প বলেন, তিনি জাকারাইয়াকে বলেছিলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি আপনার জায়গায় হলে বিষয়টি নিয়ে আরেকবার ভাবতাম। কেটি, আপনার কি এটা দরকার? আমার মনে হয় না, আপনার এটার দরকার আছে।’

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজেদের আসন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন রিপাবলিকান প্রার্থীরা। তাঁদের কেউ কেউ প্রেসিডেন্ট ও তাঁর নীতির থেকে দূরত্ব বজায় রেখে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যেতে চেষ্টা করছেন। এতে ট্রাম্পের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে মোটামুটি ঐক্যবদ্ধ থাকা দলটির ভেতরে নতুন করে চাপ ও বিভাজন তৈরি হচ্ছে।

পরে ট্রাম্প আরও বলেন, হয়তো প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্বটা ‘তাঁর জন্য নয়’।

ট্রাম্প হয়তো ভাবছেন, জাকারাইয়ার প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্বটি ‘প্রয়োজন’ কি না। তবে সংকটের সময়ে একজন দক্ষ প্রেস সেক্রেটারি থাকলে প্রেসিডেন্টরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হন—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এর ব্যতিক্রম নন।

ট্রাম্পের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো সংকট হয়তো নেই। তবে হোয়াইট হাউস যে ক্রমেই বাড়তে থাকা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে চলেছে, তা নিশ্চিত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কেটি জাকারাইয়া
ছবি: কেটির ইনস্টাগ্রাম থেকে

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজেদের আসন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন রিপাবলিকান প্রার্থীরা। তাঁদের কেউ কেউ প্রেসিডেন্ট ও তাঁর নীতির থেকে দূরত্ব বজায় রেখে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যেতে চেষ্টা করছেন। এতে ট্রাম্পের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে মোটামুটি ঐক্যবদ্ধ থাকা দলটির ভেতরে নতুন করে চাপ ও বিভাজন তৈরি হচ্ছে।

আবার একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে হোয়াইট হাউস। এর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ—যার জেরে গ্রিসে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। এ ছাড়া ডিসেম্বরে একটি সামরিক মৃত্যুদণ্ড প্রকাশ্যে সম্প্রচারের পরিকল্পনাও ব্যাপক সমালোচনার মুখে হঠাৎ বাতিল করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

একজন দক্ষ প্রেস সেক্রেটারি হয়তো এসব রাজনৈতিক ঝুঁকি সামলে নিতে পারতেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে ক্রমেই বাড়তে থাকা তোলপাড়ের মধ্যেও হোয়াইট হাউসের পছন্দের বার্তা প্রচার করে যেতে পারতেন।

ক্যারোলিন লেভিট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে আগস্টে পদত্যাগ করার আগপর্যন্ত তাঁর প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেওয়ার কয়েক মাস পর তিনি পদত্যাগ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসনের পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেওয়া, কথা বলার সময় ভুল না করা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখায় লেভিট বেশ দক্ষ ছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো মুখপাত্রের প্রয়োজন নেই। তিনি নিজেই নিজের সেরা প্রেস সেক্রেটারি।
কেটি জাকারাইয়ার

লেভিটের কাজের দক্ষতা জাকারাইয়ার জন্য উচ্চ মানদণ্ড তৈরি করেছিল। জাকারাইয়া ছিলেন তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ। সেই মানে তিনি পৌঁছাতে পারেননি, এমনকি কাছাকাছিও যেতে পারেননি। যদিও বাস্তবে তাঁর সে সুযোগই খুব বেশি ছিল না।

তবে জাকারাইয়া যে গতিতে ব্যর্থ হলেন, তা ছিল বিস্ময়কর। আধুনিককালে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে সবচেয়ে কম সময় দায়িত্ব পালন করার রেকর্ড গড়েছেন জাকারাইয়া।

আরও পড়ুন

মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে জাকারাইয়ার থেমে থেমে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর আইনি পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোই মূলত তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

এরপর গণমাধ্যমের সামনে দেওয়া জাকারাইয়ার অন্যান্য বক্তব্য পরিস্থিতি আর বদলাতে পারেনি। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রক্ষণশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভাষ্যকার শন হ্যানিটির সঙ্গে তাঁর একটি সাক্ষাৎকারও ছিল, যেখানে তাঁকে খুব একটা স্বাগত জানানো হয়নি বলে মনে হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, তিনি ওই সাক্ষাৎকার দেখেছেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প অবশ্য অনেকটা নিজেই নিজের প্রেস সেক্রেটারির ভূমিকা পালন করেছেন। ওভাল অফিস, হোয়াইট হাউসের লন কিংবা বিমানবন্দরের টারম্যাক—যেখানেই থাকুন না কেন, সেখান থেকেই তিনি বড় বড় ঘোষণা দিয়েছেন এবং নীতিতে পরিবর্তন আনার কথা নিজেই জানিয়েছেন।

ক্যারোলিন লেভিটের কাজের দক্ষতা জাকারাইয়ার জন্য উচ্চ মানদণ্ড তৈরি করেছিল। কেটি জাকারাইয়া ছিলেন তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ। সেই মানে তিনি পৌঁছাতে পারেননি, এমনকি কাছাকাছিও যেতে পারেননি।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্বে মনোনীত হওয়ার আগেই জাকারাইয়া নিজেও বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জাকারাইয়া লিখেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো মুখপাত্রের প্রয়োজন নেই। তিনি নিজেই নিজের সেরা প্রেস সেক্রেটারি।’

আরও পড়ুন

তবে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলার প্রতি ট্রাম্পের ঝোঁকের কারণে তাঁর দুই মেয়াদেই প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্বটি কঠিন হয়ে উঠেছে।

কখনো কখনো প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের কারণে তাঁর প্রেস সেক্রেটারিদের প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্যই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আবার কখনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাঁদের এমনকি কিছুই জানানো হয়নি।

হোয়াইট হাউসের সাবেক প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট
ছবি: রয়টার্স

তবে যাঁরা এই দায়িত্বে কার্যকর ছিলেন, তাঁরা এ ধরনের কঠিন পরিস্থিতিও সামলে নিয়েছেন এবং একই সঙ্গে গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক মসৃণ রেখেছেন। কৌতূহলী সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট জানিয়েছেন এবং ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠতে পারে—এমন ইস্যুগুলো শান্ত করতে সহায়তা করেছেন।

গতকাল ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, নতুন প্রেস সেক্রেটারি খুঁজতে তাঁর ‘কোনো তাড়া নেই’।

তবে ট্রাম্প যতই বলুন, তাঁর কোনো তাড়া নেই, নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে লেভিটের মতো একজন দক্ষ প্রেস সেক্রেটারির নিয়মিত সহায়তা ছাড়াই ট্রাম্পকে চলতে হবে। পরে হয়তো এই সহায়তা না থাকার বিষয়টি নিয়ে তাঁকে আফসোস করতে হতে পারে।

আরও পড়ুন