যদি আমি মরি, আপনারাও মরবেন—কেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন ট্রাম্প
শুরু থেকেই কোথাও যেন গরমিল ছিল। গত জুলাই মাসে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে বলেন, তিনি নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানে করে দেশে ফিরবেন না। অথচ সেটিতে করেই তিনি আঙ্কারায় গিয়েছিলেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে সফরে সাংবাদিকদের যে দলটি ছিল, তাদের মধ্যে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাংবাদিক গ্রাম স্ল্যাটারিও ছিলেন। তিনি বলেন, সম্মেলন শেষে ট্রাম্পের আঙ্কারা ছাড়ার আগে দিয়ে পূর্বনির্ধারিত সফরসূচিতে যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনা হয়, তা নিয়ে সাংবাদিকদের মনে অজানা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
গত ৮ জুলাই ট্রাম্পের দেশে ফেরা নিয়ে নাটকীয় মুহূর্তগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন স্ল্যাটারি।
গত বছর কাতারের রাজপরিবার থেকে ট্রাম্পকে যে উড়োজাহাজটি উপহার দেওয়া হয়, সেটির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করার পর সম্প্রতি ট্রাম্প নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান হিসেবে সেটিতে ভ্রমণ শুরু করেন। তুরস্কেও তিনি সেটিতে চেপেই গিয়েছিলেন।
অথচ হঠাৎ করেই ৮ জুলাই ট্রাম্প নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানে করে দেশে না ফেরার কথা জানান। কারণ হিসেবে বলেন, উড়োজাহাজটি আগেভাগেই ইংল্যান্ডের মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি, যাতে সেখানে কর্মরত মার্কিন সামরিক সদস্যরা সেটি ঘুরে দেখতে পারেন।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প আরও লেখেন, তিনি একটি পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে করে মিলডেনহলে যাবেন। যদিও শেষ পর্যন্ত কীভাবে ওয়াশিংটনে ফিরবেন, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
স্ল্যাটারি বলেন, সফরসূচির এ পরিবর্তন ছিল বিভ্রান্তিকর, আর ট্রাম্পের ব্যাখ্যাও খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল না। সাংবাদিকেরা নিজেদের মধ্যে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, ইরান কি প্রেসিডেন্টকে হত্যার কোনো সুনির্দিষ্ট ষড়যন্ত্র করেছে?
যেটিকে আমরা প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ বলে মনে করেছিলাম, তাতে ওঠার সময় হোয়াইট হাউসের কর্মীরা সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলেন। কারণ জানতে চাইলে বলা হয়, এটি সিক্রেট সার্ভিসের অনুরোধ।
স্ল্যাটারি আরও বলেন, ‘প্রথমত, আমাদের কাছে সেদিনের সফরসূচিই ছিল রহস্যময়। তবে যুক্তরাজ্যে যাত্রাবিরতির পর আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা ওয়াশিংটনের দিকেই ফিরছি বলে ধরে নিয়েছিলাম।’
সাংবাদিকেরা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়টি আগেই ধারণা করতে পেরেছিলেন বলেও জানান স্ল্যাটারি। তিনি বলেন, ‘যদি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়ে আমাদের প্রাথমিক ধারণা সঠিক হয়ে থাকে, তবে কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটি হয়তো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা মান পূরণ করছিল না। সেটিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সুবিধার অভাব এখনো রয়েছে বলে জানা যায়।’
হোয়াইট হাউস কেন ট্রাম্পের উড়োজাহাজ পরিবর্তন করতে চেয়েছিল, তা থেকে এটির একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এমনটা হলে এর অর্থ দাঁড়ায়, আমরা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ একটি উড্ডয়নের মুখোমুখি হতে যাচ্ছিলাম।’
৮ জুলাই ন্যাটো সম্মেলনের শেষ দিন ট্রাম্প অনিচ্ছাকৃতভাবেই সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে জল্পনাকল্পনা উসকে দিয়েছিলেন বলে মনে করেন স্ল্যাটারি। ট্রাম্প সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা থেকে শুরু করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করার সময় বারবার সাংবাদিকদের কাছে করা মন্তব্যে তাঁকে হত্যার ইরানের দীর্ঘদিনের কথিত চেষ্টার কথা তুলে ধরছিলেন।
উড়োজাহাজ থেকে নামার সময় আমরা দেখলাম, ট্রাম্প উড়োজাহাজের অন্য একটি অংশ থেকে নেমে আসছেন। পরে বোঝা যায়, এটি ছিল পুরো ছলনারই একটি সুচিন্তিত ও জটিল অংশ।
স্ল্যাটারি বলেন, ‘তুরস্ক ছাড়ার ঠিক আগে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উড়োজাহাজ পরিবর্তন নিয়ে করা প্রশ্নগুলোর বেশির ভাগই এড়িয়ে যান। এতে কিছু একটা যে স্বাভাবিক নয়—এমন অনুভূতি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
‘যে উড়োজাহাজকে আমরা প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ বলে মনে করেছিলাম, তাতে ওঠার সময় হোয়াইট হাউসের কর্মীরা সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলেন। কারণ জানতে চাইলে আমাদের বলা হয়, এটি সিক্রেট সার্ভিসের অনুরোধ।
‘এর আগে প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজে ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানতাম, এমন নির্দেশনা অস্বাভাবিক। তবে কি এটি কোনো গোপন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি আড়াল করার চেষ্টা ছিল?
‘মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই আমরা জানতে পারি, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ট্রাম্প একটি গোপনীয় অভিযানের অংশ হিসেবে ক্যাটারিং ট্রাকে করে ওই উড়োজাহাজ থেকে নেমে অন্য একটি সামরিক উড়োজাহাজে উঠেছিলেন। জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশটি ছিল সেই অভিযান গোপন রাখার জন্য।
‘এয়ারফোর্স ওয়ানে থাকলে তথ্য পাওয়া আশ্চর্যজনকভাবে কঠিন। নিরাপত্তার কারণে সাংবাদিকদের ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগও সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে।
‘আঙ্কারা থেকে মিলডেনহল পর্যন্ত উড়োজাহাজযাত্রা নির্বিঘ্নেই কেটেছিল, যদিও স্বস্তিতে থাকা কঠিন ছিল। আমরা ভুলভাবে বিশ্বাস করছিলাম যে প্রেসিডেন্ট যেকোনো মুহূর্তে উপস্থিত হতে পারেন। আর আমাদের এ যাত্রাকে ঘিরে পরিস্থিতি তখনো রহস্যে ঢাকা ছিল।
‘তখন ট্রাম্প সাংবাদিকদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপে কেন যোগ দেননি, এখন সেই কারণগুলো স্পষ্ট। তবে তাঁর অনুপস্থিতিকে আমি তখন তেমন গুরুত্ব দিইনি। কারণ, এয়ারফোর্স ওয়ানে ভ্রমণের সময় তিনি প্রায়ই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা এড়িয়ে যান। কিন্তু ভর সন্ধ্যায় যখন আমরা ইংল্যান্ডে অবতরণ করলাম, তখন যাত্রাটি আরও অস্বাভাবিক অবস্থায় মোড় নিল।
‘উড়োজাহাজ থেকে নামার সময় আমরা দেখলাম, ট্রাম্প এ উড়োজাহাজেরই অন্য একটি অংশ থেকে নেমে আসছেন। পরে বোঝা যায়, এটি ছিল পুরো ছলনারই একটি সুচিন্তিত ও জটিল অংশ।
‘এরপর হোয়াইট হাউসের কর্মীরা আমাদের ট্রাম্পকে অনুসরণ করতে বলেন। তিনি হেঁটে কাতার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের দিকে যাচ্ছিলেন। আমরা যে উড়োজাহাজ থেকে সবে নেমেছি তার কয়েক শ গজ সামনে সেটি পার্ক করা ছিল।
‘প্রেসিডেন্টের দুই পাশে সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা অবস্থান নিয়েছিলেন। আর আমাদের ডানে একটি কালো সরকারি এসইউভি ধীরে ধীরে সামনে এগেচ্ছিল।
‘এটি এমন এক কৌশল, যার মতো কিছু আমি হোয়াইট হাউস কভার করার সময় আগে দেখিনি। আমার কাছে সঙ্গে সঙ্গেই দৃশ্যটি বেশ নাটকীয় ও চলচ্চিত্রসুলভ মনে হয়েছিল। বিশেষ করে যখন এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ছিলাম।’
নতুন উড়োজাহাজে উঠে হোয়াইট হাউসের এক সহকারী সাংবাদিকদের ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের একটি পোস্টের ছাপা কপি দেন। পোস্টে কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজের সামনে জড়ো হওয়া সামরিক সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ছবি ছিল।
পোস্টে ট্রাম্প বলেন, বিমানঘাঁটির ‘পুরো’ কর্মীবাহিনী উড়োজাহাজটি দেখতে চেয়েছিল এবং মিলডেনহলে যাত্রাবিরতি করতে আঙ্কারা থেকে ওয়াশিংটনের স্বাভাবিক উড্ডয়নপথের সূচিতে ‘প্রায় কোনো বিচ্যুতিই’ করতে হয়নি।
স্ল্যাটারি বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের কেবিনে আসেন। তখন আমরা তাঁকে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকি—ইংল্যান্ডে আসার জন্য তিনি কেন কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজ ব্যবহার করেননি। এর প্রকৃত কারণ কী ছিল তা জানতে চাই।
‘সেই ঘটনার আরও এক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর আমরা জানতে পারি, ট্রাম্প আসলে মিলডেনহলে যাওয়ার পথে আমাদের সঙ্গে ছিলেনই না এবং এ ঘটনায় তৃতীয় একটি উড়োজাহাজও জড়িত ছিল।
‘অথচ, ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প এ ঘটনার পেছনে নিরাপত্তাজনিত কোনো উদ্বেগ থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন।
‘তবে আমি যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করি, কেন আমাদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল, তখন তিনি ইরানের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের হুমকির বিষয়টি স্বীকার করেন।
‘ট্রাম্প আমাদের বলেছিলেন, “কিন্তু যদি আমি (মারা) যাই, আপনারাও যাবেন। তাই তো? হয়তো কোনো এক দিন আপনারাও পেশা বদলাতে চাইবেন।”’