নিউ মেক্সিকোতে কুখ্যাত এপস্টিনের সে খামারটি আবারও আলোচনায়, কী হতো সেখানে

এপস্টিন ১৯৯৩ সালে ব্রুস কিংয়ের কাছ থেকে জোরো র‍্যাঞ্চ নামের খামারটি কিনেছিলেনছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতারা গতকাল সোমবার একটি আইন পাস করেছেন। তাঁরা বলছেন, এটিকে সেখানকার জোরো র‍্যাঞ্চ নামের খামারে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রথম পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করার উদ্যোগ বলে উল্লেখ করেছেন। কুখ্যাত মার্কিন যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের বিরুদ্ধে এ খামারে নারী পাচার এবং তাদের যৌন হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে।

দলমত–নির্বিশেষে একটি তদন্ত কমিটি ওই খামারে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ তোলা মানুষদের সাক্ষ্য নেবে। খামারটি অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সান্তা ফে থেকে প্রায় ৩০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। আইনপ্রণেতারা স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সামনে এসে তথ্য ও সাক্ষ্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এপস্টিন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মারা যান। কর্তৃপক্ষ এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে সাব্যস্ত করে। ওই সময় এপস্টিনের বিরুদ্ধে নারী পাচারসংক্রান্ত একটি মামলায় বিচারকাজ চলছিল।

তথাকথিত ‘সত্য অনুসন্ধান কমিশনে’ চারজন আইনপ্রণেতা রয়েছেন। তাঁরা এপস্টিনের ৭ হাজার ৬০০ একর আয়তনের খামারটিতে ভ্রমণকারী অতিথি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। তাঁরা আশা করছেন, এর মধ্য দিয়ে খামারের মূল ভবন ও অতিথি ভবনে সংঘটিত যৌন নির্যাতনে কারা অংশ নিয়েছিলেন, তা জানা যাবে।

ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বাধীন এই তদন্তে রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে এবং এপস্টিনের অপরাধ উদ্‌ঘাটনের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টিন সংক্রান্ত লাখ লাখ নথি প্রকাশ করেছে। ওই সব নথিতে জোরো খামারে ঘটা নানা কর্মকাণ্ডের তথ্যও আছে।

নথিগুলোতে দেখা গেছে, এপস্টিনের সঙ্গে নিউ মেক্সিকোর দুজন সাবেক ডেমোক্র্যাট গভর্নর এবং একজন অ্যাটর্নি জেনারেলের সম্পর্ক ছিল।

নিউ মেক্সিকোর প্রতিনিধি পরিষদে সর্বসম্মতভাবে পাস হওয়া একটি আইনের আওতায় খামারটি নিয়ে তদন্ত হবে। এতে এপস্টিনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা আরও রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, বিনিয়োগকারী ও খামারে যাওয়া প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ই–মেইল থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে এপস্টিন জোশুয়া রামোকে বলেছিলেন, তিনি টেন থাউজ্যান্ড ওয়েভস নামের একটি স্পা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন। সান্তা ফেতে মধ্যাহ্নভোজের জন্য দেখা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এপস্টিন। উত্তরে রামো লিখেছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আমরা পিংক বটম র‍্যাঞ্চে দেখা করব।’

এ তদন্তের জন্য ২৫ লাখ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির সমন জারি করার ক্ষমতা আছে। এর লক্ষ্য হলো, নিউ মেক্সিকোর আইনে যে দুর্বলতা থাকার কারণে এপস্টিন সেখানে সহজে কাজ করতে পেরেছিলেন, সেগুলো চিহ্নিত করা। কমিটির আগামী জুলাইয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদন এবং বছরের শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা আছে।

ভুক্তভোগীদের পক্ষে কাজ করা অধিকারকর্মীরা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, ফেডারেল তদন্তে মূলত এপস্টিনের ক্যারিবীয় দ্বীপ ও নিউইয়র্কের বাড়ির দিকে নজর দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু জোরো র‍্যাঞ্চ প্রায় উপেক্ষিত ছিল।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের মন্তব্য জানতে চাইলে তারা এফবিআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। তবে এফবিআই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

নাগরিক সমাজের দায়ের করা কয়েকটি মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে, এপস্টিন জোরো খামারে মেয়েদের যৌন হয়রানি করতেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কখনো কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।

খামারটিকে স্থানীয়ভাবে ‘প্লেবয় র‍্যাঞ্চ‘ নামে ডাকা হয়ে থাকে। আইনপ্রণেতা আন্দ্রিয়া রোমেরো বলেন, খামারটিতে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো কেন্দ্রীয় সংস্থা আগে কখনো তল্লাশি চালিয়েছে বলে তথ্য নেই।

অভিযোগ আছে, ১৯৯৬ সালের শুরুর দিকে এপস্টিন ওই খামারে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীর ওপর যৌন নিপীড়ন চালিয়েছিলেন।

জেফরি এপস্টিন ও তাঁর সাবেক বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল
ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

কী হতো জোরো র‍্যাঞ্চে

এপস্টিন ১৯৯৩ সালে ব্রুস কিংয়ের কাছ থেকে জোরো র‍্যাঞ্চে নামের খামারটি কিনেছিলেন। ব্রুস কিং তিন দফায় নিউ মেক্সিকোর গভর্নর ছিলেন এবং ২০০৯ সালে মারা যান। সান্তা ফে নিউ মেক্সিকানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপস্টিনের প্রতিষ্ঠান ২০২৩ সালে এই খামারকে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ ডন হাফিনেসের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।

গতকাল সোমবার সান্তা ফে নিউ মেক্সিকানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুখপাত্র বলেছেন, হাফিনেস যেকোনো তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছেন।

জোরো খামারের ব্যবস্থাপক ব্রাইস গর্ডন ২০০৭ সালে এফবিআইকে বলেছিলেন, এপস্টিন অতিথি এবং ম্যাসাজ থেরাপিস্টদের ওই খামারে নিয়ে আসতেন। স্থানীয় ম্যাসাজ থেরাপিস্টদেরও সেখানে কাজ করার জন্য নিয়োগ দেওয়া হতো।

আদালতে দেওয়া এক জবানবন্দিতে ভার্জিনিয়া জিউফ্রে নামের এক নারী অভিযোগ করেছিলেন, এপস্টিনের সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল তাঁকে জোরো র‍্যাঞ্চে নিউ মেক্সিকোর সাবেক গভর্নর বিল রিচার্ডসনকে ‘ম্যাসাজ‘ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ই–মেইল অনুযায়ী, ২০১৪ সালে গ্যারি কিং নিউ মেক্সিকোর গভর্নর পদে প্রতিযোগিতা করার সময় এপস্টিনের চার্টার্ড বিমান ব্যবহার করেছিলেন। ওই সময় কিং–কে এপস্টিন বলেছিলেন, চার্টার্ড বিমানের ২২ হাজার ডলার ভাড়ার মধ্যে তিনি অর্ধেকটা বহন করবেন এবং বাকি অর্ধেকটা কিং দেবেন।

জিউফ্রে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, গিলেনের কাছ থেকে ‘ম্যাসাজ’ করে দেওয়ার নির্দেশনা আসার মানেই হলো—নির্দেশপ্রাপ্ত নারীকে যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হবে।

অবশ্য রিচার্ডসনের প্রতিনিধি ম্যাডেলিন মাহোনি ২০১৯ সালে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, জিউফ্রের অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা।‘

জোরো র‍্যাঞ্চের ব্যবস্থাপক ব্রাইস গর্ডন এফবিআইকে বলেন, এপস্টিন তাঁর খামারে যে ম্যাসাজ থেরাপিস্টদের ব্যবহার করতেন, তাঁদের বেশির ভাগকেই সান্তা ফের স্থানীয় স্পা প্রতিষ্ঠান টেন থাউজ্যান্ড ওয়েভস থেকে বা পরিচিতদের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

ওই স্পা প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র সারা বিন গত মঙ্গলবার বলেছেন, টেন থাউজ্যান্ড ওয়েভস প্রতিষ্ঠান থেকে জোরো র‍্যাঞ্চে কোনো ম্যাসাজ থেরাপিস্ট পাঠানো হয়নি বা কাউকে সেখানে পাঠানোর পরামর্শও দেওয়া হয়নি।

‘সারভাইভিং জেফরি এপস্টিন‘ তথ্যচিত্রে সান্তা ফের সাবেক ম্যাসাজ থেরাপিস্ট র‍্যাচেল বেনাভিদেজ অভিযোগ করেছেন, জোরো র‍্যাঞ্চে কাজ করার সময় তিনি এপস্টিনের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

আরও পড়ুন
জেফরি এপস্টিন
ফাইল ছবি: রয়টার্স

বিনিয়োগবিষয়ক পরামর্শক জোশুয়া রামো বলেন, ২০১৪ সালে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের প্রতিনিধি হিসেবে জোরো র‍্যাঞ্চে মধ্যাহ্নভোজে গিয়েছিলেন। তখন তিনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন।

রামো আরও বলেছেন, তিনি এবং এপস্টিন ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে প্রায় ১৪ বার ব্যবসায়ী ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে দেখা করেছেন।

রামোর দাবি, খামারটিতে তাঁর সফর ও এপস্টিনের সঙ্গে অন্যান্য বৈঠকের ক্ষেত্রে তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করেছিলেন। এ কারণে তিনি ভেবেছিলেন, এপস্টিনের বিষয়ে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে যাচাই–বাছাই করেছে।

ই–মেইল থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে এপস্টিন জোশুয়া রামোকে বলেছিলেন, তিনি টেন থাউজ্যান্ড ওয়েভস নামের একটি স্পা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন। সান্তা ফেতে মধ্যাহ্নভোজের জন্য দেখা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এপস্টিন। উত্তরে রামো লিখেছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আমরা পিংক বটম র‍্যাঞ্চে দেখা করব।’

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে রামো বলেছেন, তিনি ওই মন্তব্য বা তাঁদের সাক্ষাতের বিষয়টি মনে করতে পারছেন না।

বছরের পর বছর ধরে এপস্টিন নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক প্রচারের ক্ষেত্রেও আর্থিক ভূমিকা রেখেছিলেন। যেমন বিল রিচার্ডসন এবং অ্যাটর্নি জেনারেল গ্যারি কিং। সংবাদমাধ্যমে এ–সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হওয়ার পর দুজনই প্রতিশ্রুতি দেন, তাঁরা টাকা ফিরিয়ে দেবেন বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করবেন।

ই–মেইল অনুযায়ী, ২০১৪ সালে গ্যারি কিং নিউ মেক্সিকোর গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় এপস্টিনের চার্টার্ড বিমান ব্যবহার করেছিলেন। ওই সময় কিং–কে এপস্টিন বলেছিলেন, চার্টার্ড বিমানের ২২ হাজার ডলার ভাড়ার মধ্যে তিনি অর্ধেকটা বহন করবেন এবং বাকি অর্ধেকটা কিং দেবেন।

এ ব্যাপারে কিংয়ের মন্তব্য জানার চেষ্টা করেছিল রয়টার্স। তবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন