যুদ্ধ ও উত্তেজনার কারণে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে সামরিক ব্যয়
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলার। টানা একাদশ বছরের মতো এই ব্যয় বাড়ল। আজ সোমবার স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান অনিরাপত্তা ও নতুন করে সামরিক শক্তি গড়ে তোলার প্রতিযোগিতাই রেকর্ড মাত্রায় সামরিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
সামরিক ব্যয়ে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। গত বছর এ খাতে দেশগুলোর সম্মিলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি ডলার, যা বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি।
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে কিছুটা ব্যতিক্রম যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক খাতে ব্যয়কারী দেশটি ওই বছর ব্যয় কিছুটা কমিয়েছে।
সিপ্রির গবেষক লরেনৎসো স্কারাৎসাতো বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ কমতি পুষিয়ে দিয়েছে ইউরোপ ও এশিয়ার বাড়তি ব্যয়। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধ ও উত্তেজনার মধ্যে বিশ্ব আরও একটি বছর পার করেছে।
বিশ্বের মোট জিডিপির কতটা সামরিক খাতে ব্যয় হচ্ছে, সেই অনুপাতও চলতি বছর ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ মাত্রায় উঠেছে। স্কারাৎসাতো বলেন, ‘সব সূচকই একটিই বার্তা দিচ্ছে—পৃথিবী এখন নিজেকে অনিরাপদ ভাবছে। আর সেই অনিশ্চয়তা সামলাতে দেশে দেশে অস্ত্র কেনার হিড়িক পড়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালে সামরিক খাতে ব্যয় করেছে ৯৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কম। এর প্রধান কারণ, ইউক্রেনে নতুন করে কোনো সামরিক সহায়তা অনুমোদন না হওয়া। আগের তিন বছরে ওয়াশিংটন কিয়েভকে মোট ১২ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের অস্ত্রসহায়তা দিয়েছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় কমার এই ধারা বেশি দিন টিকবে না। মার্কিন কংগ্রেস ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের জন্য ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি সামরিক বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাজেট প্রস্তাব পাস হলে ২০২৭ সালে এই ব্যয় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ইউরোপ। রাশিয়া, ইউক্রেনসহ পুরো মহাদেশে সামরিক ব্যয় ১৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে।
স্কারাৎসাতো বলেন, ইউরোপে ব্যাপক হারে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে দুটি বিষয় কাজ করেছে। একটি ইউক্রেন যুদ্ধ, অন্যটি ইউরোপের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কমে আসা। ওয়াশিংটন এখন ইউরোপকে নিজের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিজে নিতে চাপ দিচ্ছে।
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী জার্মানি। ২০২৫ সালে দেশটি এ খাতে ব্যয় করেছে ১১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। স্পেনেও ১ বছরে ৫০ শতাংশ বেড়ে সামরিক ব্যয় পৌঁছেছে ৪ হাজার ২০ কোটি ডলারে। ১৯৯৪ সালের পর দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট প্রথমবার জিডিপির ২ শতাংশ ছাড়াল।
চলমান যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়া ও ইউক্রেন উল্লেখযোগ্য হারে সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে। সরকারি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ এখন যাচ্ছে প্রতিরক্ষা খাতে।
রাশিয়ার সামরিক ব্যয় ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার কোটি ডলারে, যা দেশটির জিডিপির ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। ইউক্রেন সামরিক ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বাড়িয়ে মোট ৮ হাজার ৪১০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে, যা দেশটির মোট জিডিপির ৪০ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও এ অঞ্চলে সামরিক ব্যয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। মোট ব্যয় হয়েছে ২১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। বেশির ভাগ দেশ ব্যয় বাড়ালেও ইসরায়েল ও ইরান ব্যতিক্রমভাবে কমিয়েছে।
ইরানে সামরিক ব্যয় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৭৪০ কোটি ডলারে নেমেছে। তবে এর পেছনে মূলত ৪২ শতাংশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি দায়ী।
ইসরায়েলের সামরিক ব্যয় কমেছে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। মোট ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার। গবেষকেরা বলছেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গাজায় যুদ্ধবিরতির পর সংঘাতের তীব্রতা কমে আসায় এই পরিবর্তন এসেছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২২ সালের তুলনায় ইসরায়েলের সামরিক ব্যয় এখনো ৯৭ শতাংশ বেশি।
এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলে সামরিক ব্যয় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ৬৮ হাজার ১০০ কোটি ডলারে। ২০০৯ সালের পর এই অঞ্চলে এটাই সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধি।
স্কারাৎসাতো বলেন, এ অঞ্চলে চীনই মূল চালিকা শক্তি। তিন দশক ধরে প্রতিবছর সামরিক ব্যয় বাড়াচ্ছে দেশটি। ২০২৫ সালে চীনের আনুমানিক সামরিক ব্যয় ৩৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার।
স্কারাৎসাতোর মতে, আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া। চীনের শক্তিবৃদ্ধিকে হুমকি হিসেবে দেখে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও তাইওয়ান। তাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এসব দেশও সামরিক বাজেট বাড়াচ্ছে।
জাপান ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৬ হাজার ২২০ কোটি ডলারে নিয়ে গেছে, যা দেশটির জিডিপির ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ১৯৫৮ সালের পর সর্বোচ্চ। তাইওয়ান ব্যয় বাড়িয়েছে ১৪ শতাংশ। মোট ব৵য় করেছে ১ হাজার ৮২০ কোটি ডলার।