২০০৫ সালে চট্টগ্রাম আদালত ভবনে জঙ্গি হামলা

অধিকাংশ সাক্ষী পুলিশ আদালতে যান না

টানা ২১ মাস ধরে সাক্ষীরা হাজির না হওয়ায় চট্টগ্রাম আদালত ভবনে জঙ্গি হামলার ঘটনায় করা মামলার বিচার ঝুলে আছে। ২০০৫ সালের ২৯ নভেম্বর ওই হামলায় পুলিশসহ দুজন নিহত হন। মামলার সাক্ষীদের বেশির ভাগই পুলিশ সদস্য। এই মামলায় ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এরপর প্রায় দুই বছরে মামলার ১৫টি ধার্য দিনে একজন সাক্ষীকেও হাজির করা যায়নি।
গত ১১ বছরে এ মামলায় ৭৭ সাক্ষীর মধ্যে ২৮ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। সর্বশেষ গত ৮ জুন এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। সেদিনও সাক্ষী হাজির হননি। আদালত ২১ জুলাই সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন। প্রথম অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌসের আদালতে এখন মামলাটির বিচার চলছে।
২০০৫ সালে চট্টগ্রাম আদালত ভবনের প্রবেশপথে পুলিশের তল্লাশিচৌকির সামনে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। ঘটনাস্থলে মারা যান পুলিশ কনস্টেবল রাজীব বড়ুয়া ও আদালতে আসা দর্শনার্থী শাহাবুদ্দীন। আহত হন পুলিশ কনস্টেবল আবু রায়হান, সামসুল কবির, রফিকুল ইসলাম, আবদুল মজিদসহ ১০ জন।
২০০৬ সালের ১৮ মে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সাবেক পরিদর্শক হ্লা চিং প্রু নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমান্ডার জাবেদ ইকবাল ওরফে মোহাম্মদ ও বোমা তৈরির কারিগর জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজানকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেন আদালতে। জাবেদ ইকবাল কারাগারে আটক আছেন। আর বোমারু মিজানকে কারাগার থেকে আদালতে নেওয়ার পথে ছিনিয়ে নিয়ে যায় অন্য জঙ্গিরা। তিনি এখন পলাতক। ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে পুলিশকে হত্যা করে মিজানসহ তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয় সহযোগীরা।
আদালত সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন হাজির না হওয়া পুলিশ সাক্ষীরা হলেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগর ডিবি পুলিশের সাবেক পরিদর্শক হ্লা চিং প্রু ও কোতোয়ালি থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) জাবেদ মাসুদ, ওই থানার এসআই মোফাজ্জল হোসেন, আবু বকর সিদ্দিক, সানা উল্লাহ, কোতোয়ালি থানার সাবেক ওসি মঈন উদ্দিন, কক্সবাজার থানার এসআই মিজানুর রহমান, জামালপুর থানার এসআই রবিউল কবির, জামালপুর জেলার নারায়ণপুর তদন্ত কেন্দ্রের এসআই হারুন অর রশিদ, বগুড়ার গাবতলী থানার এসআই সানোয়ার হোসেন ও সিআইডি ঢাকার হস্তলিপি বিশারদ পুলিশ পরিদর্শক কমল ভরদ্বাজ। ২০০৬ সালের ১৮ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের সময় পুলিশ সাক্ষীরা ওই ঠিকানায় কর্মরত ছিলেন। পরে তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় বদলি হয়ে যান।
জঙ্গিদের বোমা হামলায় আহত পুলিশ কনস্টেবল রফিকুল ইসলাম এখনো পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। নগর পুলিশের রেশনিং শাখায় তিনি এখন কর্মরত রয়েছেন। গত বুধবার রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কিছুদিন পর পর হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। পুরো শরীরে স্প্লিন্টারের দাগ। জঙ্গিদের এমন শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে তারা আর কোনো মানুষকে মারতে না পারে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সাক্ষী হ্লা চিং প্রু বর্তমানে খাগড়াছড়িতে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণকেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত আছেন। গত বুধবার রাতে মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৮ সালে সমন পাওয়ার পর একবার সাক্ষ্য দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বিচারক না থাকায় সাক্ষ্য হয়নি। পরে আর সমন পাইনি। কীভাবে সাক্ষ্য দিতে যাব।’
আরেক সাক্ষী মো. মঈন উদ্দিন বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায়নি।
প্রথম অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী শহীদুল ইসলাম বলেন, আদালত থেকে প্রতিটি ধার্য তারিখে সাক্ষীদের ঠিকানায় সমন ও পরোয়ানা পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট থানা কিংবা পুলিশ থেকে কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি, ১০ মার্চ, ২৮ এপ্রিল ও ৮ জুন দিন ধার্য থাকলেও কোনো সাক্ষী হাজির না হওয়ায় সাক্ষ্য হয়নি।
মামলা পরিচালনাকারী সরকারি কৌঁসুলি অশোক কুমার দাশ প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ সাক্ষীসহ কোনো সাক্ষীকে পুলিশ হাজির করতে না পারায় মামলাটি নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না।
জঙ্গি হামলায় পুলিশ নিহত হওয়ার পরও কেন পুলিশ সাক্ষীদের হাজির করা যাচ্ছে না তা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ সাক্ষীসহ হাজির না হওয়া সব সাক্ষীর পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের মাধ্যমে তাঁদের হাজির করার কাজ চলছে। আগামী ধার্য দিনে তাঁদের আদালতে হাজির করা যাবে। এত দিন কেন হাজির করা হয়নি, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আখতার কবির চৌধুরী বলেন, যেকোনো ফৌজদারি মামলায় আদালত সমন দিলে পুলিশ সাক্ষীদের হাজির করে। কিন্তু জঙ্গিদের হামলায় পুলিশ নিহত হওয়ার মামলায় খোদ পুলিশ নিজেই সাক্ষ্য দিতে হাজির না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। মামলার দুই তদন্ত কর্মকর্তাই সাক্ষ্য দেননি। এ অবস্থায় মামলার রায় ঘোষণা করা হলে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।