
‘আমার বয়স যখন তিন দিন, তখন মা ও বাবা আমাকে দাদার বাড়ি রেখে কোথায় যেন চলে যান। তাঁরা আজও ফেরেননি। দাদা আমাকে পরিবারের সদস্য মনে করেন না। পরে ঠাঁই হয় নানার বাড়িতে। নানা ছিলেন দিনমজুর। তাই আমাকে বড় হতে হয় এতিমখানায়। দিনমজুরি করে কোনো রকম লেখাপড়া চালিয়ে গেছি। পুলিশে লোক নেবে শুনে খুলনায় আসি। টাকা না থাকায় লঞ্চঘাটেই রাত থেকে ও সকালে কিছু না খেয়ে শিরোমনি পুলিশ লাইনস পর্যন্ত (দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার) হেঁটে যাই। মাঠ পরীক্ষায় টিকে যাওয়ার পরদিন ছিল লিখিত পরীক্ষা। সামান্য রুটি আর কলা খেয়ে আবারও লঞ্চঘাটে গিয়ে রাত কাটাতে হয়। পরদিন আবার হেঁটে গিয়ে লিখিত পরীক্ষা দিই। এভাবে চাকরি হবে, তা কল্পনাও করতে পারিনি।’
নিজের নাম ঘোষণার পর যখন অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে ডাকা হলো, তখন হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই নিজের কথাগুলো বলছিলেন মো. আবুল হাসান। তাঁর ওই কথাগুলো বলার সময় চোখের পানি আটকে রাখতে পারেননি সেখানে থাকা পুলিশ সুপারসহ অন্য অভিভাবকেরা।
প্রসঙ্গত, ২৯ জুন শিরোমনি পুলিশ লাইনস মাঠে হয় মাঠ পরীক্ষা। পরদিন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ৫৪৩ জন। মৌখিক পরীক্ষা শেষে বৃহস্পতিবার রাতে জেলা পুলিশ লাইনস মাঠে ঘোষণা করা হয় নতুন নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের নাম। ১১৪ জন নতুন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাধারণ পুরুষ কোটায় ৮১ জন, সাধারণ নারী কোটায় ১৬ জন, মুক্তিযোদ্ধা পুরুষ কোটায় ১১ জন, মুক্তিযোদ্ধা নারী কোটায় একজন, পোষ্য পুরুষ তিনজন, পোষ্য নারী একজন ও এতিম একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নাম ঘোষণা করেন পুলিশ সুপার এস এম শফিউল্লাহ। নাম ঘোষণার পর পুলিশ সুপার সবার উদ্দেশে জিজ্ঞাসা করেন, আপনাদের কত টাকা খরচ হয়েছে? একবাক্যে সবাই বলেন ১০৩ টাকা। এরপর তিনি বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পুলিশ সদস্য নিয়োগ করেছি। এ ক্ষেত্রে ১০০ টাকা ট্রেজারি চালান ও তিন টাকার একটি ফরম ছাড়া প্রার্থীদের আর কোনো খরচ হয়নি। পুলিশের মহাপরিদর্শকের নির্দেশনা অনুযায়ী মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি দিতে পেরে আমরাও খুশি।’
পরে পুলিশ সুপার যাঁদের বাবা দিনমজুর ও ভ্যানচালক বা অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করেন, এমন পরিবারের সদস্যদের মঞ্চে যেতে বলেন। দেখা যায়, মোট নিয়োগ পাওয়া ছেলেমেয়েদের একটি বড় অংশই ওই ধরনের পরিবারের সদস্য। নতুন নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের ডোপ পরীক্ষাসহ অন্যান্য মেডিকেল টেস্ট করতে খরচ হয় আট হাজার টাকা। সেখানে পুলিশ সুপার সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের এক হাজার টাকা কম নিতে অনুরোধ করেন। অন্যদিকে এতিম আবুল হাসানের পুলিশ প্রশিক্ষণসহ বেতন না পাওয়ার আগ পর্যন্ত সব খরচ নিজে বহন করার ঘোষণা দেন পুলিশ সুপার।
এবার পুলিশে নিয়োগ পেয়েছেন রূপসার ভ্যানচালক মোশারফ শিকদারের মেয়ে গোলেনা খাতুন। সভাপতিত্ব করেন পুলিশ সুপার এস এম শফিউল্লাহ। নিয়োগ পরীক্ষা বোর্ডের সদস্য ছিলেন নড়াইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শরফুদ্দীন ও মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মোহাম্মদ ইব্রাহীম।