
আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্তদের চিকিৎসায় মাঠ পর্যায়ে ওষুধ নেই। আক্রান্ত মানুষ তিন বছরের বেশি ওষুধ পাচ্ছেন না। কবে আবার ওষুধ দেওয়া হবে, তা নিশ্চিত করে বলছেন না স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ও রোগীদের কাগজপত্র দেখে জানা গেছে, আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্তদের (আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত) অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ভিটামিন ডি কমপ্লেক্স ও আয়রন বড়ি দেওয়া হতো। এখন এই তিনটি বড়ির কোনোটি পান না রোগীরা।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় বিষক্রিয়া নিরসনে নতুন পুষ্টি পণ্য (নিউট্রিসিটিক্যাল) কেনার সুপারিশ করেছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সেই পণ্যটিও কিনছেন না। তাঁরা কার্যকারিতা পরীক্ষার পর কেনার সিদ্ধান্ত নিতে চান বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন। সেই প্রক্রিয়া কবে শুরু হবে তা স্পষ্ট করে তাঁরা বলছেন না।
পরিস্থিতি
কুষ্টিয়া সদর থেকে মেহেরপুর যাওয়ার পথে আলমপুর গ্রাম। মেহেরপুরের এই গ্রামে আর্সনিকের সমস্যা প্রকট। আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় এই গ্রামে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে এক পরিবারের ছয়জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই গ্রামে আর্সেনিকোসিসে আক্রান্তদের ওষুধ দিতেন। কাগজপত্রে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ২৪ জুলাই এই গ্রামের মানুষ সর্বশেষ ওষুধ পেয়েছিলেন। মেহেরপুর জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, কয়েক বছর ওষুধ সরবরাহ নেই। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কোনো নির্দেশনাও নেই।
কুষ্টিয়া জেলার সিভিল সার্জন রওশান আরা জানিয়েছেন, জেলার দৌলতপুর এলাকায় আর্সেনিকোসিসের বেশ রোগী আছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের ওষুধ দেওয়া হয় না। একই কথা জানিয়েছেন যশোর জেলার সিভিল সার্জন দিলীপ রায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে কোনো ওষুধ নেই। ওষুধ নেই বলে চিকিৎসা নিতেও কোনো রোগী সরকারি হাসপাতালে আসে না।
আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত মানুষের হালনাগাদ তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নেই। অধিদপ্তরের ‘হেলথ বুলেটিন ২০১৬’-তে বলা হয়েছে, দেশের ২০ শতাংশ মানুষ মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকযুক্ত পানি খায়। ২০১২ সালে দেশে আর্সেনিকোসিসের ক্রমপুঞ্জীভূত রোগী ছিল ৬৫ হাজার ৯১০ জন। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৫ সালে বলেছিল, আর্সেনিকের কারণে বাংলাদেশে বছরে ৪৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
আর্সেনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি খাওয়ার কারণে চামড়ায় ফুসকুড়ির মতো গোটা ওঠে, চামড়া খসকসে হয়, ঘা হয়, এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হয়। এসব জটিলতাই আর্সেনিকোসিস। আর্সেনিকোসিসের চিকিৎসায় সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই। আর্সেনিকমুক্ত পানি ব্যবহারই সমস্যা সমাধানের প্রধান বিকল্প। তবে কিছু ভিটামিন ও ওষুধ চামড়ার রুক্ষতা, ঘা নিরাময়ে কাজ করে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘একসময় আর্সেনিকোসিসের জটিলতা কমাতে ভিটামিন, আয়রন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বড়ি দেওয়া হতো। এতে রোগীর কিছুটি স্বস্তি হতো।’
উদ্যোগ নেই
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১ জানুয়ারি থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এই কর্মসূচির অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মপরিকল্পনায় আর্সেনিক মোকাবিলা ও আর্সেনিকোসিস রোগীর চিকিৎসার কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। প্রকল্প দলিলে দেখা যায়, ২০১৭ সালের বাজেটে এআরএস-ডিটক্স কেনার জন্য ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। পরবর্তী চার বছরের জন্য আরও ৩২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা আছে।
মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এআরএস-ডিটক্স কেনার জন্য বরাদ্দ রাখে মন্ত্রণালয়। বছর শেষ হতে এক মাস বাকি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ওষুধ কেনার উদ্যোগ নেয়নি।
কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, এআরএস-ডিটক্স বড়ি রোগীর পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতিতে কাজ করে। এটি তৈরি করেছে সুইডেনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভিওলা ভিটালিস। গত বছর সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার কয়লা গ্রামের ২০০ মানুষের ওপর সর্বশেষ পরীক্ষামূলক ব্যবহার হয়। ভিওলা ভিটালিস দাবি করছে, ওষুধে উপকার পেয়েছে কয়লা গ্রামের মানুষ।
সরেজমিন কয়লা গ্রাম
সাতক্ষীরার যেসব গ্রামে আর্সেনিকের প্রকোপ বেশি ছিল তার একটি কলারোয়া উপজেলার কয়লা গ্রাম। এখানে গত বছরের জুন থেকে ভিওলা ভিটালিসের কর্মীরা ২০০ মানুষকে এআরএস-ডিটক্স বড়ি ও আর্সেনিকিওর মলম দিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে এদের আর্সেনিকমুক্ত পানিও সরবরাহ করত প্রতিষ্ঠানটি।
১৬ নভেম্বর প্রথম আলোর দুজন প্রতিবেদক কয়লা গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জনের বেশি ছিল আর্সেনিকোসিস রোগী। এঁদের আটজন এআরএস-ডিটক্স বড়ি ও আর্সেনিকিওর নামের একটি মলম ব্যবহার করেছেন। এই আটজনই বলেছেন, তাঁরা উপকার পেয়েছেন। এঁদের মধ্যে একই পরিবারের তিনজন নারীও ছিলেন। তাঁদের হাতে, পায়ে, পিঠে বা শরীরের অন্য স্থানে যে ঘা বা খসখসে ভাব ছিল, তা এখন নেই। অন্যদিকে এআরএস-ডিটক্স বড়ি ও আর্সেনিকিওর ব্যবহার করেননি এমন একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, নিরাপদ পানি পানের কারণে তাঁদের আর্সেনিকোসিসের সমস্যা অনেকটাই দূর হয়েছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া অফিস, মেহেরপুরও যশোর প্রতিনিধি]