সংকট সুরাহায় বিআরটিএর সঙ্গে উবারের বৈঠক

উবার থাক, আইন বদলাক

.

মুঠোফোনের অ্যাপ্লিকেশনভিত্তিক ট্যাক্সি-সেবা ‘উবার’ বাংলাদেশে চালু করা নিয়ে জটিলতা নিরসনের পথ খোঁজা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার উবারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে দেশের সড়কে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রকারী প্রতিষ্ঠান বিআরটিএর কর্মকর্তাদের। বৈঠকের পর বিআরটিএর পরিচালক নুরুল ইসলাম বলেন, তিন সপ্তাহের মধ্যে এ দেশে উবারের কার্যক্রম ও ব্যবসার পরিকল্পনা জানিয়ে আবেদন করতে বলা হয়েছে।
আবেদন পাওয়ার পর উবারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে বিআরটিএ। আর পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত ২৫ নভেম্বর উবার বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিআরটিএর বিজ্ঞপ্তি বহাল থাকবে।
উবার ঢাকায় চালুর ঘোষণা দেওয়া হয় ২২ নভেম্বর। তিন দিন পরই বিআরটিএ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে উবারকে বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করে। তবে ঘোষণার পরও উবারের সেবা বন্ধ থাকেনি। এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক চলছে। বেশির ভাগ মন্তব্যই উবারের পক্ষে। যাঁরা এর মধ্যেই উবার ব্যবহার করেছেন তাঁরা বলছেন, ঢাকায় এ রকম ব্যবস্থা থাকা উচিত।
বিআরটিএ বলছে, তারাও উবারের মতো ট্যাক্সি-সেবা রাখার পক্ষে। কিন্তু বাদ সেধেছে প্রচলিত আইনকানুন। দেশের আইনে ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়ায় চালানো যায় না। আইনজ্ঞরা বলছেন, উবারের মতো ব্যবস্থা চালু রাখতে প্রয়োজনে এর জন্য আলাদা নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে ব্যক্তিগত গাড়িও ভাড়ায় চালানো যায়।
উবার হলো একটি মুঠোফোন অ্যাপ, যা গাড়ি ব্যবহারকারী ও চালক উভয় পক্ষকেই যুক্ত করে। গাড়ির প্রয়োজন হলে ব্যবহারকারী অ্যাপে ঢুকে দেখতে পান তাঁর কাছাকাছি কোনো উবার নিবন্ধিত ট্যাক্সি আছে কি না। আবার ব্যবহারকারী ট্যাক্সির চাহিদা দিলে চালকেরাও বিষয়টি অ্যাপে বুঝতে পারেন এবং সাড়া দিতে পারেন। গাড়িতে ওঠার পর গন্তব্যস্থল অ্যাপে জানানো হলে সেই অ্যাপই হিসাব কষে সম্ভাব্য ভাড়ার অঙ্ক বলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি উবার এখন পৃথিবীর সব মহাদেশেই সেবা দিচ্ছে। পাশের দেশ ভারতের বড় শহরগুলোতেও চলছে উবারের ট্যাক্সি।

ঢাকায় উবারে চড়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে মহিতুল আলম নামে একজন বেসরকারি চাকরিজীবী প্রথম আলোকে বলেন, ২৪ নভেম্বর রাত সাড়ে আটটার দিকে তিনি বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে সংগীতানুষ্ঠান থেকে বের হওয়ার সময় উবার অ্যাপে দেখেন, বনানী কবরস্থানের কাছে একটি গাড়ির চিহ্ন দেখানো হচ্ছে। তিনি কল করার পর ১০ মিনিটের মধ্যেই টয়োটা অ্যালিয়ন ব্র্যান্ডের গাড়িটি আর্মি স্টেডিয়ামের ফটকে এসে দাঁড়ায়। গাড়িতে ওঠার পরে উবার অ্যাপে মিরপুরের আনসার ক্যাম্প পর্যন্ত সম্ভাব্য ভাড়া দেখায় ২৩২ থেকে ২৯০ টাকার মধ্যে। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ভাড়া ওঠে ২৯৩ টাকা। গাড়ির ভেতরটা পরিচ্ছন্ন ও শীতাতপব্যবস্থা চালু ছিল।

আরেকজন গাড়ি ব্যবহারকারী হাসান ইমাম বলেন, উবারের ভাড়া সিএনজি অটোরিকশার মতো। বাড়তি পাওনা মানসম্মত গাড়ি। চালকেরা নিবন্ধিত থাকায় তাঁদের পরিচয়ের বিস্তারিত জানার সুযোগ রয়েছে। তাই অঘটনের আশঙ্কা কম।

যেভাবে চলছে ঢাকার উবার: ঢাকার কয়েকজন গাড়ির মালিক ও মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার অন্যান্য রেন্ট-এ–কার কোম্পানির মতোই মাসিক ভিত্তিতে ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া নিয়ে উবারে চালাচ্ছেন মধ্যস্থতাকারীরা।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে উবারে গাড়ি ভাড়ায় মধ্যস্থতাকারী (ভেন্ডর) মো. ইমরান বলেন, তাঁর দেওয়া ৪০টি গাড়ি এখন উবারে চলছে। তিনি মাসিক হিসাবে গাড়ি ভাড়া নিয়ে উবারে চালান।

উবারে গাড়ি চালিয়েছেন এমন একজন চালক জুয়েল শেখ বলেন, ভাড়ার গাড়ি ছিনতাইয়ের ভয় থাকে। এই ব্যবস্থায় এ ধরনের ঘটনার আশঙ্কা কম, কারণ সব যাত্রীও নিবন্ধিত।

বিআরটিএর আপত্তি যেখানে: ২৫ নভেম্বর বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সরকারের অনুমোদন ছাড়া ট্যাক্সি-সেবা পরিচালনাকে সম্পূর্ণ বেআইনি, অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করেছে বিআরটিএ।

বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. নুরুল ইসলামের বরাতে দেওয়া ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনা হয়ে থাকে ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস গাইডলাইন, ২০১০ অনুযায়ী। কোনো কোম্পানি ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনা করলে তাকে অবশ্যই বিআরটিএর মাধ্যমে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অনুমতি নিতে হবে। এ ছাড়া মোটরযান বিধিমালা অনুযায়ী (ভাড়ায়চালিত) প্রতিটি মোটর কার ও মাইক্রোবাসের পৃথক রং (কালো বডি ও হলুদ টপ) থাকা এবং মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রুট পারমিট গ্রহণ বাধ্যতামূলক।

তবে গত সোমবার যোগাযোগ করা হলে বিআরটিএর পরিচালক নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে গাড়ি ভাড়ার যে বন্দোবস্ত উবার করছে, তা নিয়ে বিআরটিএর কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সে ক্ষেত্রে উবারকে ভাড়ায় চালানোর জন্য নিবন্ধন নেওয়া সবুজ নম্বরপ্লেট–সংবলিত গাড়ি ব্যবহার করে জনগণকে সেবাটা দিতে হবে।

নুরুল ইসলাম বলেন, ‘একটা ভুল–বোঝাবুঝি হচ্ছে। আমরা বলতে চাই, উবারের অ্যাপ্লিকেশন বা গাড়ি ভাড়া দেওয়া-নেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে বিআরটিএর কোনো আপত্তি নেই। বরং এই যুগে হাতের মুঠোয় থাকা প্রযুক্তি দিয়ে যদি মানুষের পরিবহন সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব করা যায়, তাতে সহায়তা করতে চায় বিআরটিএ। সমস্যা হচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়ায় চালানো নিয়ে।’

কয়েকজন মন্ত্রী ইতিমধ্যে উবারের পক্ষে বলেছেন, তাহলে তাঁরা কিসের ভিত্তিতে উবারের সেবাকে স্বাগত জানাচ্ছেন, জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়রা হয়তো মানুষের কষ্ট লাঘব করতে চান বলেই এ রকম বলেছেন। কিন্তু তাঁরাও আইনের বিষয়টা অবহিত আছেন। এখন তাঁরা উদ্যোগ নিলে আইনগত জটিলতাও কাটবে।’

যোগাযোগ করা হলে আইনজ্ঞ শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, উবারের বিষয়টা আইনের জন্য একটা নতুন পরিস্থিতি। যখন যানবাহনের নিবন্ধন-সংক্রান্ত এই আইনগুলো করা হয়েছিল, তখন তো আর উবারের বিষয়টা কারও মাথায় ছিল না। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের উচিত হবে পক্ষ-বিপক্ষের কথা শুনে, সবার সুবিধার কথা বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া। প্রয়োজনে আইনটা বদল হতে পারে।

শাহদীন মালিক বলেন, উবারকেও রাখতে হবে, আবার যে কেউ এসে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ব্যবসা শুরু করবেন, সেটাও হতে দেওয়া যাবে না। এর জন্য মাঝামাঝি একটা নিবন্ধনব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। অর্থাৎ, যেসব মালিক ব্যক্তিগত গাড়ি উবারের মতো প্ল্যাটফর্মে ভাড়ায় চালাতে চান, তাঁদের জন্য পৃথক একটা নিবন্ধনব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

বিআরটিএর বৈঠক: বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা বলেন, গতকাল অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবা দানকারী দুটি প্রতিষ্ঠান উবার ও শেয়ার এ মোটরবাইককে (স্যাম) আলোচনার জন্য বিআরটিএর কার্যালয়ে ডাকা হয়।

এ দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলার পরে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বাণিজ্যিকভাবে নিবন্ধিত গাড়ি দিয়ে যদি উবার সেবা দিতে পারে, তাহলে বিআরটিএর কোনো আপত্তি থাকবে না। ব্যক্তিগত গাড়ির মাধ্যমে উবার এ সেবা দিতে পারবে না। তবে উবারের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করতে হলে বিআরটিএ সহায়তা করবে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, আইনে কোনো পরিবর্তন করতে হলে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হবে।

উবারের পক্ষে উৎসব আগরওয়াল, বিপ্লব শর্মা ও কাজী জুলকারনাইন বিআরটিএ কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা প্রায় দুই ঘণ্টা বিআরটিএর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেন। তবে উবার প্রতিনিধিরা সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

বৈঠকের পরে স্যামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজ কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের ধারণাটা শুনে ভালো লেগেছে বলে জানিয়েছেন বিআরটিএর চেয়ারম্যান, তবে স্পষ্ট কিছু বলেননি। তিনি বলেন, মোটরসাইকেল আরোহী ও যাত্রীদের সুবিধার্থে এ অ্যাপ চালু করেছেন। এখন পর্যন্ত দেড় হাজার বাইকচালক ও আড়াইহাজার যাত্রী এটিতে নিবন্ধন করেছেন।