একজন নিংপ্রুচাই মারমার অন্য রকম স্বপ্ন

নিজের গড়া স্বপ্নের পাঠশালায় নিংপ্রুচাই মারমা। সম্প্রতি মহালছড়ির সিঙ্গিনালায়। প্রথম আলো
নিজের গড়া স্বপ্নের পাঠশালায় নিংপ্রুচাই মারমা। সম্প্রতি মহালছড়ির সিঙ্গিনালায়।  প্রথম আলো

পাঠাগারে নীরবতা। বই পড়ছে বিভিন্ন বয়সী ১৫-২০ জন পাঠক। কেউ পড়ছে উপন্যাস, কেউ শিশুতোষ বই, কেউবা ভ্রমণকাহিনি। এমন দৃশ্য দেখা যাবে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার সিঙ্গিনালা এলাকার ‘স্বপ্নের পাঠাশালা’য় গেলে।

এ পাঠাগারের পাঠকদের মধ্যে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী, যাঁদের বয়স ৬ থেকে ৩০ বছর। তবে মাঝেমধ্যে আরও বয়সীরাও আসেন। চাইলে যেকেউ বই এক মাসের জন্য বাসায় নিয়ে পড়তে পারে। তবে ফেরত দিতে হয় সময়মতো।

এলাকার ছেলেমেয়েদের বই পড়ার উৎসাহ জোগাতে ২০১৯ সালে সিঙ্গিনালার বাসিন্দা নিংপ্রুচাই মারমা নিজ প্রচেষ্টা আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এটি গড়ে তোলা সহজ ছিল না। তিনি একজন ক্যানসার রোগী। হুইলচেয়ারেই তাঁর বসবাস।

জানা গেল, স্কুলে পড়ার সময় থেকেই গ্রামের ছেলেমেয়েদের নানাভাবে পড়ালেখায় সাহায্য করতেন নিংপ্রুচাই। বিদ্যালয়ের মাঠে বসে প্রাইভেট পড়াতেন বিনা পয়সায়। বই কিনে অন্যদের পড়তে দিতেন। তাঁর ছাত্ররা অনেকে এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, অনেকে চাকরি করছেন। ছিলেন স্কুলের ফুটবল দলের অধিনায়ক।

নিংপ্রুচাই মারমা সিঙ্গিনালা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০০২ সালে এসএসসি, খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ থেকে ২০০৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ২০১০ সালে। চাকরি করেন কক্সবাজার বর্ডার গার্ড স্কুল ও রামু ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে। 

সম্প্রতি খাগড়াছড়ি থেকে প্রায় ৩১ কিলোমিটার দূরে মহালছড়ির সিঙ্গিনালায় গিয়ে দেখা যায়, মাটির দেয়াল ও টিনের ছাউনি দেওয়া তিন রুমের নিংপ্রুচাই মারমার পৈতৃক ঘর। এই ঘরের এক পাশে টিনের বারান্দা নামিয়ে তৈরি করেছেন তাঁর ‘স্বপ্নের পাঠশালা’। এখানে পড়তে এসেছেন ২০-২৫ পাঠক-পাঠিকা। বই রাখার জন্য আছে একটা র‍্যাক আর দুটো টেবিল। আর পাঠকদের বসার জন্য তৈরি করেছেন উঁচু ও নিচু আকারের বেঞ্চ।

ঘরেই গল্প হয় নিংপ্রুচাই মারমার সঙ্গে। বাবা উষাপ্রু মারমা ও মা পোয়াচাইন্দা মারমার তিন সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হলেও চাকরি ছেড়ে দেন ৩৫ বছর আগে। এরপরও সংসার ভালোই চলছিল। তবে ১৯৯৫ সালে মায়ের অসুস্থতার সময় জায়গাজমি বিক্রি করে চিকিৎসা করানো হয়। তবুও বাঁচানো যায়নি মাকে। এরপর থেকে সংসারে নেমে আসে অভাব-অনটন। খেয়ে, না খেয়ে প্রাইভেট আর লজিং থেকে স্কুল কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। চাকরি করে সংসারের হাল ধরার কিছুদিনের মধ্যেই ২০১৮ সালের অক্টোবরে শরীরে ধরা পড়ে ক্যানসার।

নিংপ্রুচাই মারমা বলেন, ‘দেড় মাস ভারতে চিকিৎসা শেষে বাড়ি আসার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। নির্মম আর নিষ্ঠুর নিয়তির ইশারায় যখন হুইলচেয়ারবন্দী হলাম, তখন এমন কিছু স্বপ্নের কথা মনে হলো, যে স্বপ্নগুলো আমি এত বছর দেখে এসেছি। আমার পা থেকে কোমর পর্যন্ত অবশ, কিন্তু ব্রেন তো সচল। এ চিন্তা থেকে “স্বপ্নের পাঠশালা” গড়ি। এর মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার যেন নতুন অর্থ খুঁজে পাই। শারীরিক কষ্টের মধ্যেও পাঠাগার বাঁচিয়ে রেখেছে আমাকে।’

তবে প্রথম থেকে তাঁকে সাহস, অনুপ্রেরণা আর সহযোগিতা করছেন স্ত্রী নুচিংঞোয়াই মারমা ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মংসানু মারমা।

এখনো প্রতি মাসে নিংপ্রুচাইকে ওষুধের জন্য ব্যয় করতে হয় ১৫ হাজার টাকা। চিকিৎসকেরা বলেছেন, টিউমার আরেকবার অপারেশন করতে হবে। তবে নিজেকে নিয়ে চিন্তা করেন না তিনি। স্বপ্ন দেখেন, পাঠাগার একদিন বড় হবে। থাকবে হাজার হাজার বই। মানুষ বই পড়বে, আলোকিত হবে।

এই পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ক্যাচিংপ্রু মারমা। তিনি বলেন, ‘ছোট থেকে দাদার কাছে পড়েছি। এখনো গ্রামে এলে প্রতিদিন বিকেলে আসি পাঠাগারে বই পড়তে। তাঁর দেখানো পথেই আজ এত দূর এসেছি। তবে শঙ্কা হয় দাদার জন্যও।’