নারায়ণগঞ্জে পাঁচ খুনের ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

একাই পাঁচজনকে হত্যা করেন মাহফুজ!

নারায়ণগঞ্জ শহরের বাবুরাইল এলাকায় একই পরিবারের দুই শিশুসহ পাঁচজনকে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন মামলার বাদী শফিকুলের ভাগনে মাহফুজ। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি একাই পাঁচজনকে হত্যা করেছেন বলে দাবি করেন।
নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইদুজ্জামান শরীফের আদালতে মাহফুজ এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মাহফুজের স্বীকারোক্তির বিষয়ে আদালত, পুলিশ ও আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, তাসলিমার (৩০) স্বামী ও সংশ্লিষ্ট মামলার বাদী শফিকুল ইসলামের ভাগনে মাহফুজ (২১) খবর পান, ঘটনার দিন গত শুক্রবার রাতে তাঁর দুই মামা শফিকুল ও শরীফুল বাড়িতে থাকবেন না। এই সুযোগে তিনি ছোট মামি লামিয়ার (২২) সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার ইচ্ছায় সন্ধ্যায় ওই বাড়িতে যান। দরজা খুলে দেয় মামাতো ভাই শিশু শান্ত (১০)। তিনি যে ঘরে ঢুকেছেন, তা না বলতে শান্তকে ১০ টাকা দেন। পরে লামিয়ার ঘরে খাটের নিচে লুকিয়ে থাকেন মাহফুজ।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাসলিমার খালাতো ভাই মোশারফ ওরফে মোরশেদ (২২) বাড়িতে এসে রাতের খাবার খেয়ে তাসলিমা ও লামিয়ার সঙ্গে একটি কক্ষে টেলিভিশন দেখছিলেন। রাত সাড়ে ১২টার কিছু পরে লামিয়া তাঁর জা তাসলিমার কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। এ সময় লামিয়ার নির্ধারিত কক্ষে ঘুমাতে যান মোশারফ। রাত আড়াইটার দিকে মাহফুজ এই কক্ষের খাটের নিচ থেকে বেরিয়ে বাথরুমে যাওয়ার সময় তাঁকে ধরেন মোশারফ। পরে বকাঝকা করে তাসলিমাকে বিষয়টি জানান। রাত গভীর হওয়ায় মাহফুজকে কক্ষে অবস্থান করতে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েন মোশারফ। রাত সাড়ে তিনটার দিকে মাহফুজ রান্নাঘর থেকে শিল এনে মোশারফের মাথায় আঘাত করেন এবং গলায় শার্ট পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। সকাল সাড়ে ছয়টায় তাসলিমা শান্তকে গুছিয়ে স্কুলে যেতে ঘর থেকে নামিয়ে দিয়ে আবার শুয়ে পড়েন।
রাতে ঘরে লুকিয়ে থাকার বিষয়টি জেনে যাওয়ায় বড় মামি তাসলিমাকেও হত্যার পরিকল্পনা করেন মাহফুজ। পরে তাসলিমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে মোশারফের কক্ষের কাছে নিয়ে শিল দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। এতে সেখানেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। মোশারফের কক্ষ থেকে কাপড়ের টুকরা এনে গলায় পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর শিল হাতে লামিয়ার কক্ষে গেলে তা টের পান তিনি। লামিয়া ভয়ে বিছানার ওপর দাঁড়িয়ে যান। এ সময় লামিয়াকে শিল ছুড়ে মারলে তাঁর মাথায় লাগে। লামিয়া শিল তুলে পাল্টা মাহফুজকে মারার চেষ্টা করলে সেটি হাত থেকে ফসকে তাসলিমার ছোট মেয়ে সুমাইয়ার (৫) মাথায় লাগে। পরে শিল তুলে লামিয়ার মাথায় আবার আঘাত করলে তিনি খাটের ওপর পড়ে যান। তখন লামিয়ার গলায় পা চেপে ধরলে তিনি মারা যান। এরপর একটি রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে সুমাইয়াকে মেরে ফেলেন মাহফুজ।
এদিকে সকাল সোয়া সাতটার দিকেই স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দরজা নাড়তে থাকে শান্ত। দরজা খুলে দেওয়ার পর শান্ত মা তাসলিমাকে ডাকাডাকি করলে মাহফুজ তার ঘাড় ধরে ধাক্কা দেন। দেয়ালে মাথা লেগে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে শিশু শান্ত। পরে টুকরা কাপড় দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে তাঁর মৃত্যুও নিশ্চিত করেন মাহফুজ। এভাবে পাঁচজনকেই হত্যার পর নিজ কর্মস্থল মোশারফের কারখানায় যান মাহফুজ। কিন্তু খারাপ লাগায় কারখানার বাথরুমে গোসল করে বেরিয়ে যান।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবুল খায়েরের ভাষ্য, টঙ্গীর বোর্ডবাজার এলাকায় ছিল শফিকুল ও শরীফের পরিবার। কিন্তু মামার বাসায় বেড়াতে গিয়ে ছোট মামি লামিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে মাহফুজের। বিষয়টি জানাজানির পর দুই মামাই পরিবার নিয়ে ঢাকার কলাবাগানে চলে যান। সেখানে তাসলিমা বিভিন্নজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ১৫-২০ লাখ টাকা ঋণ নেন। কিন্তু ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে পাওনাদারদের চাপে বছর খানেক আগে নারায়ণগঞ্জে চলে যান। বাসা পাল্টে সর্বশেষ শহরের বাবুরাইল এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে বাসা ভাড়া নেন। বাসার পাশেই মোশারফের কারখানায় একসময় কাজ নেন মাহফুজ। তখন থেকেই মাহফুজ আবার বাসায় যাতায়াত শুরু করেন। ছোট মামি লামিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে ঘিরে হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে পারিবারিক সালিসে মাহফুজকে জুতাপেটা করা হয়। এতে মাহফুজ ক্ষিপ্ত হন এবং প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত ভাত না খাওয়ার শপথ করেন। সেই অনুযায়ী গত দুই সপ্তাহ বিস্কুট, রুটি, কলা খেয়েই ছিলেন।
অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর কে এম ফজলুর রহমান মাহফুজের স্বীকারোক্তিমূলক এই জবানবন্দির কথা নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে বেলা সোয়া একটায় জেলা পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন তাঁর কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, চাঞ্চল্যকর এই পাঁচ খুনের ঘটনা তদন্তে পুলিশের পাঁচটি দল কাজ করেছে। দুজনকে গ্রেপ্তার ও বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তার অপর আসামি নাজমা সম্পর্কে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন পুলিশ সুপার। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত শিল ও অন্যান্য আলামত সংরক্ষণ করা হয়েছে।
গত শনিবার বাবুরাইল এলাকার ওই বাসা থেকে দরজার তালা ভেঙে দুই শিশুসহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত তাসলিমার স্বামী শফিকুল নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।