সরকারি খাতায় তাঁর পদবি সহকারী সার্জন। নিজের নামের পাশে লিখছেন মেডিসিন, সার্জারি, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ চিকিৎসক ও সার্জন। তিনি আরও লিখছেন, প্রসূতি-স্ত্রীরোগ ও অবেদনবিদের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং (পিজিটি) ও সিএমইউ (আল্টা)। এ পরিচয় দিয়ে তিনি সরকারি হাসপাতালসহ কয়েকটি ক্লিনিক ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দিচ্ছেন। এ ছাড়া তিনি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক কোয়ার্টারেও একই পরিচয় দিয়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছেন।
ওই চিকিৎসকের নাম মো. আবুল কাসেম৷ তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও)৷ স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, এমবিবিএস সনদ ছাড়া আবুল কাসেমের আর কোনো সনদ নেই ৷
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) ২০১০ সালের আইনে বলা আছে, নিবন্ধনকৃত কোনো মেডিকেল চিকিৎসক বা ডেন্টাল চিকিৎসক এমন কোনো নাম, পদবি বা বিবরণ এমনভাবে ব্যবহার বা প্রকাশ করবেন না, যার ফলে তাঁর অতিরিক্ত কোনো পেশাগত যোগ্যতা আছে বলে কেউ মনে করতে পারে। বিএমডিসি আইনে স্বীকৃতি নেই এমন ডিগ্রি ও পদবি ব্যবহার অপরাধ। এই অপরাধে তিন বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের কথা আইনে বলা হয়েছে।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৮৭ জন প্রসূতির অস্ত্রোপচার হয়। ওই ৮৭ প্রসূতির সবারই অস্ত্রোপচার করেছেন আবুল কাসেম। আবুল কাসেম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়াও পাশের মমি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামে একটি ক্লিনিকে খণ্ডকালীন চিকিৎসক হিসেবে প্রসূতিসহ নানা অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি রোগীদের চিকৎসাসেবা দেন।
তবে আবুল কাসেম দাবি করেন, তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ২০০৮ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এক বছর মেয়াদি কোর্সে অ্যানেসথেটিস্ট হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন৷ একই মেডিকেল কলেজ থেকে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায়ও পিজিটি করেছেন৷ অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর অনুমোদন দিয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর আশপাশের ক্লিনিকে প্রসূতির অস্ত্রোপচার করতাম। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গাইনি চিকিৎসকের সংকটে প্রসূতির অস্ত্রোপচার বন্ধ হয়ে গেলে সাবেক সিভিল সার্জন কাজল কুমার কুন্ডু স্যার আমাকে হাসপাতালে প্রসূতি অস্ত্রোপচার শুরু করতে নির্দেশ দেন। সেই থেকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার চালিয়ে যাচ্ছি।’ তবে যেসব যোগ্যতার কথা লিখছেন তা বিএমডিসি থেকে স্বীকৃতি নেওয়া হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেছেন।
এ ব্যাপারে সাবেক সিভিল সার্জন কাজল কুমার কুন্ডু মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আবুল কাসেমকে প্রসূতির অস্ত্রোপচার করতে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে যে নির্দেশের কথা বলা হচ্ছে, তা ঠিক নয়।’
এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ইয়াকুব আলী মোড়ল বলেন, ‘এখানে যোগদানের পরই দেখছি আবুল কাসেম প্রসূতির অস্ত্রোপচার করছেন। পরে শুনেছি প্রসূতির অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁর বিএমডিসি স্বীকৃত যোগ্যতা নেই।’
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) ঠাকুরগাঁও জেলার সভাপতি আবু মো. খয়রুল কবীর বলেন, এমবিবিএস সনদ ছাড়া আবুল কাসেমের কোনো সনদের কথা তাঁদের জানা নেই৷ বিএমডিসি স্বীকৃত যোগ্যতা না থাকার পরও আবুল কাসেম কীভাবে প্রসূতির অস্ত্রোপচার করছেন, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্জন করেননি বা কোনো ডিগ্রিই নয়, এমন অনেক কিছুই নামের সঙ্গে ব্যবহার করছেন একশ্রেণির চিকিৎসক। এ বিষয়ে সিভিল সার্জনের কার্যালয় ও বিএমএর পক্ষ থেকে শিগগিরই আইনের ধারা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে। বিজ্ঞপ্তিতে অস্বীকৃত যোগ্যতা ব্যবহার না করতে চিকিৎসকদের অনুরোধ করা হবে।