
এয়ারকন্ডিশনার বা এসি, বিলাসিতা ছাপিয়ে বর্তমানে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি গৃহস্থালি পণ্য। তবে মনে রাখতে হবে, একটু অসচেতনতায় এই আরামদায়ক পণ্যটিই হতে পারে জীবননাশী। এসি বিস্ফোরিত হয়ে প্রায়ই নানা দুর্ঘটনার খবর শোনা যায়।
‘সিঙ্গার বাংলাদেশে’র সহকারী ব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামান জানান, ‘এসি-দুর্ঘটনার পেছনে তিন-চারটি কারণ রয়েছে। অনেকেই রুমের লোড অনুপাতে এসি ব্যবহার করেন না। ফলে এসিটি অনেকক্ষণ ধরে চলে এবং অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়।
নিম্নমানের এসি কিনলে সেগুলোর ভেতর ফ্যান, তার ও বিদ্যুতের ব্যবস্থাগুলো সঠিক থাকে না। ফলে সেখানেও কারিগরি ত্রুটি দেখা যায়, যা অনেক সময় আগুনের সূত্রপাত করতে পারে।’
সারা বিশ্বেই এসি থেকে দুর্ঘটনায় তথা অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় অগ্নিনিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুসারে, এসিজনিত দুর্ঘটনায় তাদের দেশে বছরে ২০ জনের মৃত্যু হয় আর ক্ষতি হয় আট কোটি টাকার বেশি সম্পদের। বাংলাদেশেও এসির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার সংখ্যাও। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুসারে, দেশে গত দুই বছরে ৭১টি এসি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকার।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এসি স্থাপন ও সংযোগব্যবস্থায় ত্রুটি, অতিরিক্ত তাপ, ময়লা ও দূষণ, পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট এবং আশপাশে দাহ্য পদার্থের উপস্থিতিÑএসবই সাধারণত এসি দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘এসি দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ হলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। এসিতে যদি কারিগরি ত্রুটি থাকে, তাহলে আগুন ধরে যেতে পারে বা এসির গ্যাসে আগুন লেগে ছড়িয়ে পড়তে পারে ঘরে।’
এসির মধ্যে ধুলা জমে গেলে তা অভ্যন্তরীণ উপাদানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কনডেনসারে ময়লা জমলে এসি তাপ বাইরে বের করতে পারে না। এতে তাপ ও চাপ বেড়ে গিয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে বাংলাদেশে এসি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে বাহ্যিক কারণকেই প্রধান বলে মনে করা হয়। গ্যাসের লাইনে ছিদ্র কিংবা রুমে থাকা দাহ্য পদার্থ থেকে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে এসির যত্ন নেওয়া ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি কক্ষে যাতে কোনো দাহ্য পদার্থ না থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
এসি কোনো বিপজ্জনক যন্ত্র নয়। সারা বিশ্বেই এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসির মধ্যে যেসব রাসায়নিক, যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ আছেÑকোনোটির মাধ্যমেই স্বাভাবিক অবস্থায় অগ্নিকাণ্ড ঘটার কথা নয়। যেসব দুর্ঘটনা হচ্ছে, তার অধিকাংশই মূলত বাহ্যিক কারণে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এসি বিপজ্জনক হবে না।
এসি-বিস্ফোরণের কারণ...
১. এসির কনডেনসারে ময়লা থাকলে কমপ্রেশারে হাই টেম্পারেচার এবং হাইপ্রেশার তৈরি হয়ে।
২. এসির ভেতরের পাইপের কোথাও ব্লকেজ হলে হাইপ্রেশার তৈরি হয়ে কমপ্রেসর ব্লাস্ট হতে পারে।
৩. সঠিক স্পেকের পাওয়ার কেব্ল ব্যবহার না করলে।
৪. কমপ্রেসরের লিমিটের চেয়ে বেশি রেফ্রিজারেন্ট চার্জ করলে এবং সঠিক পদ্ধতিতে রেফ্রিজারেন্ট চার্জ না করলে হাইপ্রেশার তৈরি হয়ে।
৫. সঠিক রেটিংয়ের সার্কিট-ব্রেকার ব্যবহার না করলে।
৬. সঠিকভাবে এসির ভ্যাকুয়াম না করলে।
১. ভালো মানের এবং সঠিক স্পেকের পাওয়ার কেব্ল ব্যবহার করা।
২. এসির কনডেনসার নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।
৩. কমপ্রেসরে হাই টেম্পারেচার এবং হাইপ্রেশার তৈরি হচ্ছে কি না, পরীক্ষা করা।
৪. কমপ্রেসরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ রেফ্রিজারেন্ট আছে কি না, তা অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান দ্বারা পরীক্ষা করা এবং লিমিটের চেয়ে বেশি রেফ্রিজারেন্ট চার্জ না করা এবং সঠিক পদ্ধতিতে রেফ্রিজারেন্ট চার্জ করা।
৫. এসির ভেতরের পাইপের কোথাও ব্লকেজ আছে কি না, পরীক্ষা করা।
৬. সঠিকভাবে এসির ভ্যাকুয়াম ও রেটিংয়ের সার্কিট ব্রেকার ব্যবহার করতে হবে।
৭. বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের এসি, কমপ্রেসর এবং রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার করতে হবে।
৮. বারান্দায় কিংবা খুব কাছে না রেখে ঘরের বাইরে এসি ‘আউটডোর সেট’ করা।
৯. দীর্ঘদিন বন্ধ রাখার পর এসি চালু করার আগে একজন দক্ষ সার্ভিস-এক্সপার্ট দিয়ে এসি পরীক্ষা করে নেওয়া।