
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখনো সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। এখনো এটি বিদেশ-ফেরতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ ভাইরাস প্রতিরোধ করা। কোভিড সংক্রমিত রোগ ঠেকাতে পারব, এটা কেউ বলতে পারবে না। কারণ, রোগ তার নিজস্ব গতিতেই এগোচ্ছে। আমরা বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং করছি কত দ্রুত এ ভাইরাস শনাক্ত করা যায়। এটা আসতই, এসেছে। কিন্তু ব্যাপকভিত্তিক মহামারি ঠেকানোর ক্ষমতা আমাদের আছে, অনেক দেশের আছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার কাঠামোটা, অর্থাৎ যাঁরা রোগ প্রতিরোধে, রোগনিয়ন্ত্রণে কাজ করেন, রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, যেটার আগে নাম ছিল ম্যালেরিয়া ইনস্টিটিউট। সেই ম্যালেরিয়া নির্মূল হয়েছে রোগতাত্ত্বিক নিয়ম অনুসরণ করে। ডায়রিয়া আমরা নিয়ন্ত্রণ করেছি। যখনই কোনো সংক্রমণের ব্যাপকভাবে প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, সেটা কিন্তু আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
এই রোগে যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের তিন ধরনের রোগ। এক. মৃদু লক্ষণযুক্ত, মাঝারি লক্ষণযুক্ত এবং ক্রিটিক্যাল। ক্রিটিক্যাল রোগী হাসপাতালে এলে কোভিড আছে কি না, নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিদেশফেরত রোগী এবং যাঁরা তাঁর সংস্পর্শে ছিলেন, তাঁদের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। করোনা আছে কি না, দুভাবে অনুসন্ধান চালাচ্ছি। একদিকে আক্রান্ত ৬৫টি দেশ থেকে যাঁরা আসছেন, তাঁদের পরীক্ষা করার কথা বলছি। আর দেশের ভেতরে যাঁরা আছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কোভিডে আক্রান্ত হলে তাঁদের নমুনা নিয়ে দেখার কথা বলছি।
এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তো অবশ্যই আছে। কারণ, মৃদু সংক্রমণযুক্ত ব্যক্তিরা যদি হাসপাতালে না আসেন, তাঁদের কাছ থেকে ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা আছে। তিনি যদি স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিনে না থাকেন, সেখান থেকে ছড়াবে। এ জন্য আমরা বারবার বলছি, অবহেলা করবেন না, এটা আপনাদের নাগরিক দায়িত্ব। কেউ যদি বিদেশ থেকে আসেন বা তাঁর সংস্পর্শে থাকেন, লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে আইইডিসিআরে ফোন করুন। আমরা সরাসরি হাসপাতালে আসতে বলছি না। কারণ, তিনি যদি লক্ষণযুক্ত হয়ে পরবর্তী পর্যায়ে কোভিড-১৯ পজিটিভ প্রমাণিত হন, তাহলে তিনি তো লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর রোগটা ছড়াতে ছড়াতে যাচ্ছেন। কাজেই আইইডিসিআরে ফোন করলে আমরা নমুনা সংগ্রহ করে নিশ্চিত হব। এর সঙ্গে সঙ্গে রোগতাত্ত্বিক কোনো সংযোগ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হয়তো অনেকে ফোন করতে চাইবেন না সামাজিকভাবে বিব্রত হওয়ার কারণে। সে জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের বাসায় যাওয়ায় সমস্যা হলে লক্ষণযুক্ত ব্যক্তিকে মাস্ক পরে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে বলা হবে। সেখানে তার নমুনা সংগ্রহ করা হবে।
এখনকার চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সন্দেহজনক কোভিড রোগী যদি দেশের ভেতরে পাওয়া যায়, যার সঙ্গে দৃশ্যত চীন বা ইতালি থেকে আসা কোনো লোকের সংস্পর্শ নেই, তাহলে বুঝতে হবে ভাইরাসটা ছড়িয়ে পড়েছে। এটাকে অবশ্যই মোকাবিলা করতে হবে। আমরা জনগণকে আহ্বান জানাই, কোথাও অস্বাভাবিক অসুস্থতা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আইইডিসিআরের হটলাইনে ফোন করুন। আইইডিসিআরের ১৭টি হটলাইন আছে, পুলিশের ৯৯৯–এও ফোন করতে পারেন। অজানা কারণে মৃত্যু হয়েছে, এমন ঘটলে অবশ্যই আইইডিসিআরের হটলাইনে খবর দেবেন। সবচেয়ে বড় কর্তব্য হচ্ছে দ্রুত শনাক্ত করে রোগীকে আইসোলেশন করা। অসুস্থ ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়া, মারা গেলে সৎকার করা, দাফন করা, যাতে রোগটা না ছড়ায়। সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করে সুস্থ ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। তাঁর সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের কোয়ারেন্টিন করা। অনেকে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনবসতির ঝুঁকির কথা বলেন, কিন্তু এর ইতিবাচক দিকও আছে। কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত খবর পাওয়া যায়, দ্রুত শনাক্ত করা যায়। বিদেশ থেকে যাঁরা আসেন, তাঁদের স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিন করবেন—নিজেদের জন্য, পরিবারের জন্য, আত্মীয়স্বজনের জন্য। অবহেলা করবেন না। যখনই লক্ষণগুলো পাবেন, তখনই জানাবেন। হাসপাতালে আসাকে আমরা অনুমোদন করি না, আইইডিসিআরে ফোন করবেন।
এই সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে আমাদের এখন থেকেই কিছু অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, যাতে এ ভাইরাস আমরা বন্দী করে ফেলতে পারি। প্রথমত, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। হাঁচি-কাশি এলে নাক-মুখ ঢেকে রাখতে হবে। যেখানে–সেখানে কফ, থুতু ফেলা যাবে না। এসব বিষয়ে শিষ্টাচার গড়ে তুলতে হবে। হ্যান্ডশেক ও কোলাকুলি করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে বিকল্প উপায়ে সম্ভাষণ বিনিময় করতে হবে। করোনার ঝুঁকি বয়স্কদের ক্ষেত্রে বেশি। বিশেষ করে সত্তরোর্ধ্বদের। তাঁরা অনাবশ্যকভাবে ভ্রমণ বা ভিড়ের জায়গায় যাবেন না। এর সঙ্গে যুক্ত যাঁদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা, অ্যাজমা আছে, তাঁদের ভ্রমণের দরকার নেই। ভিড় এড়িয়ে চলবেন।
এ মুহূর্তে দ্রুত রোগী শনাক্ত করা এবং সুস্থদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিকিৎসা দিতে হবে। এটাকে আমাদের একটা যুদ্ধকালীন চেতনা নিয়ে সব নাগরিক, সরকারের সব অংশকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আমরা বাংলাদেশে অতীতে মহামারি ঠেকিয়েছি, এবারও অবশ্যই আমরা পারব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক বলেছেন, এটা এমন একাটা বিশ্ব মহামারি, যেটাকে ঠেকিয়ে দেওয়া যায়। যেটা চীন পেরেছে।