
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে সর্বস্তরের মানুষ।
আজ ২৫ মে। দ্রোহ ও প্রেমের কবির ১১৫তম জন্মবার্ষিকী। কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সারা দেশে উত্সবমুখর আয়োজনে দিনটি পালিত হচ্ছে।
সকালেই বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসায় ফুলে ফুলে কবির সমাধি ছেয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কবির পরিবার, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং শ্রেণিপেশার সংগঠনের পক্ষ থেকে কবির কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করা হয়েছে।
বরাবরের মতো এবারও জাতীয় পর্যায়ে নজরুলজয়ন্তী পালনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে।
সকালে কবির কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ ছাড়াও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
গতকাল শনিবার থেকেই শুরু হয়েছে ছায়ানটের দুই দিনের নজরুল উত্সব। আজ রোববার থেকে তিন দিনের অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে নজরুল ইনস্টিটিউটের আয়োজনে। প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় এই অনুষ্ঠান শুরু হবে ধানমন্ডির ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে।
নজরুল একাডেমিও তিন দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। তাদের অনুষ্ঠান হবে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে। অনুষ্ঠান শুরু হবে প্রতিদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটায়।
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৪ মে, ১৮৯৯) কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম। বাবা কাজী ফকির আহমেদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম। শৈশব থেকেই অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। জীবিকার দায়ে ঠেকেছিলেন শৈশবেই। লেটো দলের বাদক, রেল গার্ডের খানসামা, রুটির দোকানের শ্রমিক—এভাবেই পেরিয়ে গেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর। ঘটনাবহুল ছিল তাঁর জীবন। পরে কাজ করেছেন সৈনিক হিসেবে। সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন এইচএমভি ও কলকাতা বেতারে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে পথে নেমেছেন। পাশাপাশি সাহিত্য সাধনা তো ছিলই। শাসকের কোপানলে পড়েছেন, কারারুদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু নত হয়নি নজরুলের উচ্চ শির।
‘চির উন্নত মম শির’ বলে কাজী নজরুল ইসলাম সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে।
কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। নির্ভীকচিত্তে গেয়েছেন মানবতার জয়গান। দারিদ্র্যের কশাঘাত সহ্য করেছেন, ভোগ করেছেন নির্যাতন-নিপীড়ন; কিন্তু ব্যক্তিগত লোভ-লাভ-খ্যাতির মোহের কাছে কখনো আত্ম-বিক্রি করেননি। নিজের বিশ্বাস ও চেতনার জায়গায় থেকেছেন অনড়, আপসহীন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দীপ্তিতে ভাস্বর বাংলা সাহিত্যের ভুবনে স্বতন্ত্র ভাষারীতি ও শব্দের প্রয়োগে এক নতুন কাব্যধারার সংযোগ করেছিলেন নজরুল, যা তাঁকে যেমন বিপুলভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছিল, তেমনি সমৃদ্ধ করেছিল বাংলা কবিতাকেও। একইভাবে বাংলা গানের ক্ষেত্রেও তিনি নতুন মাত্রা সংযোজন করেছিলেন। উত্তর ভারতীয় রাগসংগীতের দৃঢ় ভিত্তির ওপর রচনা করেছেন আধুনিক বাংলা গানের সৌধ। প্রবর্তন করেছেন বাংলা গজল।
এসব সত্ত্বেও নজরুল ইসলাম অগণিত মানুষের বিপুল ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার আসনে আসীন হয়েছিলেন তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও নির্যাতিত-নিপীড়িত মানবতার প্রতি গভীর দরদের জন্য। তিনি মানুষকে জাগিয়েছেন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে, শোষণের শৃঙ্খল ভাঙার আন্দোলনে। এখানেই তিনি সমকালের দাবি মিটিয়েও চিরকালীন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তাঁরা কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।