
নদী ভাঙছে। পায়ে হেঁটে ওপরে ওঠার রাস্তাও ভেঙে পড়ছে। তাই নৌকা ভেড়ানোর জুতসই জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝি নৌকা একদিক থেকে আরেক দিকে নিচ্ছেন। নদীর ধারে সারি সারি মানুষ বসে ভাঙনের গতিবিধি দেখছেন। কারও মুখে মাস্ক নেই। ৯ জুলাই রাজশাহীর পবা উপজেলার চরখিদিরপুর গ্রামের দৃশ্যটি ছিল এমনই।
রাজশাহী জেলার চারটি উপজেলার ভেতর দিয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পদ্মা নদী বয়ে গেছে। এই নদীর চরে গড়ে উঠেছে ৩০টি গ্রাম। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা এই গ্রামগুলোতে প্রায় ৭৩ হাজার মানুষের বসবাস। জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে চরের গ্রামে যেতে হয় পদ্মা নদী পার হয়ে। এর মধ্যে রয়েছে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর, গোদাগাড়ী উপজেলার চরআষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন ও পবা উপজেলার দুটি ইউনিয়নের চারটি গ্রাম। এখন পর্যন্ত এই চরের গ্রামের কোনো মানুষের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। করোনার চেয়ে বেশি আতঙ্কের বিষয় নদীভাঙন। তবে করোনার প্রভাবে চরের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নানা শঙ্কা আর উদ্বেগে মানুষ। আছে হতাশা। কোথাও কোথাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বাল্যবিবাহ। ৭ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত চার দিনে চরের প্রায় ১৫টি গ্রাম ঘুরে মানুষের জীবনযাপনের এই চিত্র পাওয়া গেছে।
নিঃসংকোচ অসতর্কতা
শহরের লোকজনের মুখে মাস্ক দেখে একধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হচ্ছে। চরখিদিরপুরে নৌকা থেকে নেমে কারও মুখে মাস্ক না দেখে সে কথা কথা তুলতেই গৃহবধূ রিমা বেগম, কৃষক রফিকুল ইসলাম কিংবা জেলে আশরাফুল হক সবাই নিঃসংকোচে বলে উঠলেন, ‘চরে তো করোনা নেই। মাস্ক কী দরকার।’
পরের দিন ১০ জুলাই শুক্রবার পবা উপজেলারই চর মাঝারদিয়াড় গ্রামের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পাকের মোড়ে অর্ধশত মানুষের ভিড় দেখে থামতে হলো। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তাঁরা একটা রাস্তা নিয়ে সালিসে বসেছেন। তাঁদেরও কারও মুখে কোনো মাস্ক নেই। হুমায়ুন কবির নামের স্থানীয় একজন গরু ব্যবসায়ীর কার্যালয়ে চলছিল জমজমাট আড্ডা। তাঁদেরও কারও মুখে মাস্ক ছিল না।
প্রধান পেশায় আঘাত
খিদিরপুরে দেখা গেল, মাঠজুড়ে গরু চরে বেড়াচ্ছে। চার রাখাল আমিনুল, আয়নাল, রুবেল ও রান্টু মাঠে গরু ছেড়ে গরু খেদানো লাঠি তৈরি করছে। পাশেই মিডল চরজুড়ে কাশবনে গরু ছড়িয়ে রয়েছে।
চরের মানুষের প্রধান পেশা গবাদিপশু পালন। প্রতিটি পরিবারেই আছে গরু-ছাগল-মহিষ। তবে গরুই বেশি। কেউ গরুর দুধ বেচেন, কেউ গরু মোটাতাজা করেন। এঁরা সবাই বিপদে পড়েছেন। কারও একারই ১০০টি বা তারও বেশি গরু রয়েছে।
সম্প্রতি মাঠে ছেড়ে দিয়ে গরু পালনের পাশাপাশি কোরবানিকে সামনে রেখে গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পও হাতে নিয়েছেন তাঁরা। তবে করোনা পরিস্থিতিতে গরুর বাজার নিয়ে তাঁরা দুচিন্তায়। গত চার মাস থেকে পালের গরুর দুধ বিক্রি হচ্ছে না। বাঘার চকরাজাপুর ও পবার চর মাঝারদিয়াড়ে দুধের দাম এখন ৩৫ টাকা লিটার। তা–ও এক লিটারে ২০০ মিলিলিটার বেশি দিতে হয়। এ জন্য অনেকেই আর দুধ বিক্রি করছেন না। নিজেরা খাচ্ছেন, বাছুরকে দিয়ে খাওয়াচ্ছেন। চরখিদিরপুরের ঘাটে দেখা হয়েছিল দুধের ব্যাপারী (ঘোষ) শহিদুল ইসলামের (৪৫) সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে প্রতিদিন দেড় মণ দুধ চর থেকে তিনি রাজশাহী শহরে নিয়ে যেতেন। এখন ১৫ লিটারের বেশি নেন না। শহরের হোটেল, মিষ্টির দোকান, চায়ের দোকান—কিছুই ভালো চলছে না। এই ১৫ লিটার দুধ বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করবেন। চর থেকে ফেরার সময় দেখা গেল, শহিদুল ঘাটেই বসে রয়েছেন। শহরে যাননি কেন, জানতে চাইলে বললেন, ১৫ লিটার দুধ বেচে সংসার চালানোই দায়। বসে ছিলেন খেয়ানৌকার জন্য। এখন আর খেয়ানৌকা আগের মতো আসে না। এইটুকু দুধের জন্য তো আর নিজে একটা নৌকা ভাড়া করতে পারবেন না। তাই বসে আছেন।
>করোনায় কেউ আক্রান্ত হননি
তবে মহামারির কারণে দুধের চাহিদা নেই, গরুর দাম নেই
নানা শঙ্কা আর অস্বস্তিতে মানুষ
গরুহাট বন্ধ ছিল। কয়েক সপ্তাহ হচ্ছে হাট লেগেছে। মাঝারদিয়াড়ের নওশাদ আলী (৩০) বললেন, হাট বসলেও গরু কেনার লোক নেই। লোকসানে বিক্রি করে সংসার চালাতে হচ্ছে। ১০-১২টা গরুর দুধ হচ্ছে, তা–ও বিক্রি করতে পারছেন না। দুধের পাইকারই আসেন না। তাই বাছুরে খাচ্ছে। বাঘার চকরাজাপুর গ্রামের কৃষক কামরুজ্জামান (৪০) বললেন, পৌনে তিন লাখ টাকায় এক জোড়া ষাঁড় কিনেছিলেন। আশা করেছিলেন, চার লাখ টাকার বেশি দামে বিক্রি হবে। এখন বাজারের যে অবস্থা, আসল টাকা উঠবে কি না, সেই চিন্তায় আছেন। এক বিঘা জমির ঘাসের দাম ১০ হাজার টাকা। এক হাজার আউড়ের (মুঠো বাঁধা খড়) দাম ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। তিনি বলেন, বেড়ে গেছে গরুর খাবারের দাম। কমে গেছে গরুর দাম। কোরবানির আগে প্রতিবছর কয়েক দফা গরু হাত বদল হয়। এবার একবারও হয়নি।
দুশ্চিন্তায় চরের সবাই। মাঝারদিয়াড়ের খামারি টিয়া আলম তাঁর বাসায় ধরে নিয়ে গেলেন গরু দেখানোর জন্য। যেতে যেতে দেখা গেল, সব বাড়িতেই ষাঁড়। টিয়া আলমের ছয়টি ষাঁড় দেখার মতো। তিনি বললেন, দেড় লাখ টাকার কমে বিক্রি করলে তাঁর লাভ হবে না। কিন্তু বাজার দেখে তিনি হতাশ।
বর্ষায় ভারতের ব্যবসায়ীরা পদ্মা নদীর উজান থেকে কলার ভেলায় অথবা পাটের জাগের ওপরে গরু বেঁধে গরুর ওজনের সঙ্গে এমনভাবে ভারসাম্য তৈরি করে, যাতে ভেলার ওপরে শুধু গরুর মাথাটা বের হয়ে থাকে। আর শরীরটা পানির ভেতরে ডুবে থাকে। গরুর গায়ে নম্বর দিয়ে ভারত থেকে ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয় কোন ব্যবসায়ীর গরু কোনটা। ভাসতে ভাসতে গরু বাংলাদেশের সীমানায় এলে সেই ব্যবসায়ীর রাখালেরা গরু ধরে নেন। এক জোড়া গরু ধরে একজন রাখাল ৫০০ টাকা পায়।
কথায় কথায় জানা হলো, গ্রামে নাকি ৫০০ রাখাল রয়েছে। আসাদুল ইসলাম (২৪) নামের একজন রাখালের সঙ্গে কথা হয়। লেখাপড়া জানেন না। রাখালি করার জন্য মুঠোফোন চালাতে পারলেই হয়। তিনি বললেন, বর্ষার মৌসুমে রাখালি করে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন। এবার ভারত থেকে গরু না আসার কারণে শুধুই বসে আছেন।
টিকে আছেন মাছ ধরে
আউশ ধানও পোকায় খেয়েছে। তবে নদীতে মাছ আছে। ৭ জুলাই বেলা ১১টা। বাঘার চর কালিদাসখালী গ্রামের আজিজুল (৩৫), মফিদুল (৩৩) ও রাজিব (৩১) পাতিল হাতে করে পদ্মা নদী থেকে ফিরছেন। সবার পাতিলেই অল্প কিছু ছোট মাছ। তিনজনই বললেন, নদীর মাছের দাম আছে বলে তাঁরা টিকে আছেন। দিনান্তে যেটুকু মাছ ধরছেন, তাই বিক্রি করে চাল কিনছেন। দেখা গেল গ্রামের বাড়ি বাড়ি মাছ ধরার ফাঁদ (দোয়াড়) তৈরির কাজ চলছে।
বেড়েছে বাল্যবিবাহ
চরে শতভাগ বাল্যবিবাহ হয়, কিন্তু গ্রামের মানুষ কেউ মুখে স্বীকার করেন না। শিশুদের কাছে তাদের খেলার সাথিদের বিয়ের খবর পাওয়া যায়। খিদিরপুরে নদীর ঘাটে তুলে রাখা একটি নৌকায় বসে চারটি শিশু খেলছিল। তাদের মধ্যে দুটি মেয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। স্কুল বন্ধের মধ্যে কয়জনের বিয়ে হয়েছে জানতে চাইলে তাদের একজন হাতের আঙুল গুনে হিসাব কষে বলল, বিশটা তো হবেই। আরও বলল, গতকালই তার স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির একটি মেয়ের বিয়ে হলো।
তার কাছ থেকে ঠিকানা পাওয়া গেল। গ্রামের পুব পাশে নানির বাড়িতে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল মেয়েটির। সেই নানির বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, বিয়েবাড়ির আয়োজন শেষই হয়নি। মেয়ের মা শেফালী (৩০) বেগমকে পাওয়া গেল। মেয়ের বিয়ের কথা স্বীকার করলেন। বললেন, গ্রামে সবাই ছোটতেই বিয়ে দেয়। বড় হলে বেশি টাকা লাগবে। তারা গরিব মানুষ, তাই দিয়েছেন। তাঁর মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে পাশ থেকে আরেকজন নারী বললেন, ‘বিয়ে না দিয়ে কী করব। এই যে স্কুল বন্ধ হয়ে আছে। কী হয় না হয়, ঠিক নাই। আমার ভাইয়ের মেয়ের জন্য আমরাও জামাই খুঁজছি।’ পাশ থেকে আরেকজন নারী এসে বললেন, ‘এই গ্রামের মানুষের কথা হচ্ছে, আমার মেয়ের বিয়ে আমি দেব, আপনি বলার কে।’ পপি বেগম (৩৫) নামে আরেকজন বললেন, তাঁর বিয়ে হয়েছিল পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়। তার মেয়েদেরও বিয়ে দিয়েছেন সেই বয়সে। সংসার করছে। চরের এটাই নিয়ম।
বাঘার চকরাজাপুর উচ্চবিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, এই বন্ধের মধ্যে তাঁর বিদ্যালয়ে অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহ হয়ে গেছে। সংখ্যাটি শুনে অবিশ্বাস্য মনে হলো। ছাত্রীদের তথ্য লেখার জন্য তাঁর হাতে খাতা-কলম ধরিয়ে দেওয়া হলো। তিনি একে একে লিখতে থাকলেন।
দু-একটি নাম মনে না পড়লে প্রয়োজনে কাউকে ফোন করে জেনে নিতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি তিনি দশম শ্রেণির ২০টি, নবম শ্রেণির ১২টি, অষ্টম শ্রেণির ৬টি, সপ্তম শ্রেণির ১৬ ও ষষ্ঠ শ্রেণির ১টি মেয়ের নাম লিখে ফেললেন। এবার যোগ করে মোট সংখ্যা দাঁড়াল ৫৯। ওই শিক্ষক অনুমান করে যা বলেছিলেন, বাস্তব হিসাব তাকে ছাড়িয়ে গেল।
কীভাবে এত বাল্যবিবাহ হচ্ছে, এ প্রসঙ্গে চকরাজাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুল আযম বলেন, সবাই চুরি করে বিয়ে দেয়।
সংখ্যা তিনি বলতে পারবেন না, কিন্তু অনেক হচ্ছে, এটা বলা যায়। তাঁর বাড়ির পাশের একটি মেয়ের বিয়ে কখন হয়েছে, তিনি বুঝতেই পারেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, চরের বিয়ে দেন শহরের কাজিরা। গোপনে এই কাজিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বিয়ের কাবিননামায় সাক্ষীরা সবাই সই করেন। বর-কনে সই করেন, কিন্তু কাবিননামায় কোনো তারিখ দেওয়া হয় না।
বেহাল চিকিৎসাব্যবস্থা
চরখিদিরপুরের তিন হাজার মানুষকে চিকিৎসা দিচ্ছেন পল্লিচিকিৎসক পারভেজ সাজ্জাদ (৪০)। মোটরসাইকেলে ওষুধের ব্যাগ ঝুলিয়ে যাচ্ছিলেন। এলাকার চিকিৎসার হাল জানতে চাইলে বললেন, ‘কারও করোনা নাই। বাচ্চাদের পাতলা পায়খানা হচ্ছে, স্যালাইন দিলেই ঠিক হয়ে যাচ্ছে।’
স্থানীয়রা জানালেন, চর মাঝারদিয়াড়ে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। তিন মাসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমিউনিটি হেলথ সার্ভিস প্রোভাইডার পদের একজন স্বাস্থ্যকর্মী সপ্তাহে এক দিন আসেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শামীম বললেন, ‘বড় ধরনের কোনো সমস্যা হলে আমাদের মরা ছাড়া কোনো উপায় নেই। খরার সময় চার কিলোমিটার হেঁটে দুইবার নৌকা পাল্টে পদ্মা পার হতে হয়।’
আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে। সেখানে বড় কোনো চিকিৎসক যান না। তবে সেখানে বেশ কয়েকজন গ্রাম্য চিকিৎসকের খোঁজ পাওয়া গেল। তাঁরাই মানুষের বিপদের ভরসা।
তবে করোনা নিয়ে তাঁরা তেমন চিন্তিত নন। পবার হরিপুর ইনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বজলে রেজবি আল হাসান মনে করেন, চরের লোকজন সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। তাই এদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেশি। তবে তাঁরা সতর্ক থাকছেন। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে চরের লোকেরা শহরের আত্মীয়স্বজনকে আসতে নিষেধ করেছে। আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ বললেন, এই ইউনিয়নের চাকরিচ্যুত শতাধিক শ্রমিক ঢাকা থেকে ফিরেছেন। তাঁরা তাঁদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে বাধ্য করেছেন। সামনে ঈদে কেউ বাইরে থেকে আসতে চাইলে তাঁদেরকে পদ্মা নদী পার হতে দেবেন না বলে তাঁরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। একান্তই কেউ এসে পড়লে তাঁর জন্য স্কুলঘর ঠিক করে রাখা হয়েছে, তবে বাড়ি যেতে দেওয়া হবে না।