'করোনা শুনেই মনকে বুঝিয়েছি ভেঙে পড়লে হবে না'

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে, ঘরে থাকতে হবে—এই খবরে জরুরি কাজগুলো সারতে লিলি বেগমকে (৬০) ঘন ঘন বাইরে যেতে হলো। কয়েক দিন পর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। নমুনা পরীক্ষায় জানা গেল, তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। ময়মনসিংহে প্রথম তাঁর করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে গত ২৮ এপ্রিল তিনি বাড়ি ফিরেছেন।

লিলি বেগমের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পৌর শহরে। তিনি বিআরডিবিতে চাকরি করেন। গত শনিবার দুপুরে প্রথম আলোকে তিনি শোনালেন করোনাজয়ের গল্প।

কীভাবে জানলেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে লিলি বেগম বলেন, জ্বর এল। সঙ্গে বমি বমি ভাব, মাথা ‍ঘুরানো। আগে দুবার টাইফয়েড হয়েছিল। তৃতীয়বার টাইফয়েডের শঙ্কায় তিনি গেলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানকার চিকিৎসকেরা সন্দেহ করেন, তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। এ জন্য নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরের দিন সন্ধ্যায় তিনি জানতে পারেন, তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন—এই খবর শোনার সময়কার অনুভূতি জানিয়ে লিলি বেগম বলেন, ‘এমন একটা খবর জানার পর নিজেকে সামাল দেওয়া খুব কঠিন ছিল। কিন্তু শুরুতেই আমি মনে শক্তি সঞ্চয় করি। করোনা শুনেই মনকে বুঝিয়েছি ভেঙে পড়লে হবে না। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনটি সন্তানকে বড় করেছি। সবার ছোট ছেলের পড়াশোনা শেষ, এখনো তাঁর চাকরি হয়নি। কাজেই আমার দায়িত্ব এখনো শেষ হয়নি। আমাকেই বাঁচতেই হবে।’

লিলি বেগমের স্বামী মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম মারা যান ১৭ বছর আগে। এরপর থেকে দুই ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে সংগ্রামী জীবন শুরু তাঁর। ৯ এপ্রিল সন্ধ্যার দিকে পুলিশের ফোনে জানতে পারেন, তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। কিছুক্ষণ পর ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান ফোন করে তাঁকে ‘মা’ ডেকে বলেন, অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হচ্ছে। তিনি যেন চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহে আসেন।

এরপর শুরু হয় করোনাভাইরাসের সঙ্গে প্রকৃত যুদ্ধ। লিলি বেগম বলেন, দিনের মধ্যে অনেকবার স্যালাইন পান করেছেন। কোনো কোনো সময় শরীরে এমন প্রতিক্রিয়া হতো যে তা প্রকাশ করার মতো নয়। তিনি বলেন, ‘সহজে শুতে যেতাম না। মনে হতো শুয়ে পড়লেই আমি দুর্বল হয়ে যাব। বেশির ভাগ সময় জায়নামাজে বসে আল্লাহকে ডাকতাম। আনুমানিক ১২ দিন পর কিছুটা সুস্থ বোধ করতে শুরু করি। আরও কয়েক দিন হাসপাতালে ছিলাম। পরে আমাকে ছাড়পত্র দিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠানো হয়।’

লিলি বেগম কৃতজ্ঞতা জানান ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমানসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের প্রতি। বললেন, জেলা প্রশাসক প্রায়ই ফোন করে তাঁর খবর নিতেন। বিআরডিবির মহাপরিচালকও ফোন করে খোঁজখবর নিয়েছেন। সবার দোয়ায় তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন।