কালো পানির এক ফাতেমার গল্প

নিমাই কাঁসারীর ফাতেমা বেগম। ছবি: আসাদুজ্জামান
নিমাই কাঁসারীর ফাতেমা বেগম। ছবি: আসাদুজ্জামান

কুচকুচে কালো পানিতে উৎকট গন্ধ। হঠাৎ কেউ সেখানে গেলে হড়হড়িয়ে বমি করে ফেলবে। অথচ এক মাস এমন পানিতে ফাতেমা বেগমের বাস। এমন পানিতে থাকতে কার ভালো লাগে? কিন্তু ফাতেমা নিরুপায়। বিছানায় পড়ে আছেন অসুস্থ স্বামী। তাঁকে নিয়ে নড়ার জো নেই। তিন ছেলে আলাদা সংসার পেতেছেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এখন অন্যের বাসায় কাজ করে সংসার চালান। ঘরে-বাইরে হরদম দুর্গন্ধের মধ্যে থেকে এখন তিনি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। কয়েক দিন জ্বরে ভোগার পর এখন কিছুটা খাড়া হতে পেরেছেন। কিন্তু এভাবে থাকা যাবে কত দিন?

ফাতেমা বেগম থাকেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক নিমাইকাঁসারী এলাকায়। তাঁর বাসা ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের ধারে। রাস্তা থেকেই দেখা যায়, কালো রঙের পানির দখলে ফাতেমার ঘর। কেবল ফাতেমা নন, তাঁর এলাকার অন্তত এক শ ঘরে পানি। হাঁটুর ওপরে পানি ভেঙে লোক ঢুকছে তাঁদের ঘরে। ফাতেমার ঘরের সামনে গেলে পানিবন্দী জীবন যে কত কষ্টের, তার বর্ণনা শুরু করেন। রোজার আগে পানি আসা শুরু হয়। এলাকার কারও ঘরে তখন পানি ঢোকেনি। তবে ঘরের সামনে পানি বাড়ছিল। কিন্তু রোজার শুরুর দিকে ফাতেমাদের এলাকার অনেকের ঘরে পানি ঢুকতে শুরু করে।

ঢাকার যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, কদমতলীসহ অনেক এলাকার সব পানি তাঁদের ঘরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খাল হয়ে যাচ্ছে শিমরাইল পানির পাম্পে। ১০ রোজার পর পানি বাড়তে থাকে। তলিয়ে যেতে থাকে ফাতেমাদের ঘরবাড়ি।

ফাতেমার খাওয়ার পানির বড় অভাব। মল-মূত্রে ভরা পানিতে পানির লাইন ডুবে যাওয়ায় থালাবাটি ধোয়ার মতো পানি নেই। এমনিতে দুই বেলা ডাল-ভাত জোটাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁর। এর মধ্যে ভালো পানি পাবেন কোথায়? কোনো কোনো দিন খাবার পানি কিনে আনেন। কিন্তু থালাবাটি ধুতে হয় ওই ময়লা পানিতেই। আর পানিতে ফাতেমার শৌচাগার ডুবে আছে। আশপাশের শৌচাগারগুলোর একই অবস্থা। বাধ্য হয়ে যে এলাকায় পানি ওঠেনি, সেখানে যেতে হচ্ছে ফাতেমার।

এক মাসের বেশি সময় ধরে পানিতে ফাতেমারা ডুবে থাকলেও তাঁদের দুঃখ দেখতে এলাকার কোনো জনপ্রতিনিধি আসেননি। এ নিয়ে ফাতেমার মনে অনেক কষ্ট। ভোটের আগে আগে এসব জনপ্রতিনিধিরাই তাঁদের ঘরে প্রায় ঢুঁ মারতেন। আশ্বাস দিতেন, সুখে-দুঃখে তাঁরা পাশে থাকবেন। ঘরে পানি উঠলে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য জনপ্রতিনিধিদের কাছে গেছেন ফাতেমা, কিন্তু শূন্য হাতে ফিরে এসেছেন। তিনি বুঝে গেছেন বাস্তবতা। ঘরে পড়ে আছেন স্বামী। অর্থের অভাবে ঠিকমতো ওষুধও জোগাড় করতে পারেন না। চোখের সামনে ধুঁকছেন, অথচ ঘরে পানি, বাইরে পানি। এই পানি ভেঙে ছুটতে হচ্ছে কাজে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ধারে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের নিমাই কাঁসারী এলাকায় ফাতেমাদের ঘরবাড়ি দখলে নিয়েছে কালো পানি। ছবি: আসাদুজ্জামান

ফাতেমা বলছিলেন, ‘আমাদের কেউই দ্যাখে না। এত যে সাহায্য-সহযোগিতা আসে, আমি কিচ্ছু পাই নাই। অহন আমরা ১০ টাকার মাল, কেউ জিজ্ঞাসও করে না। যখন ইলেকশনের সময়টা হয়, সেই সময় ইলেকশনের ভোটের লাইগ্যা পাগল হয়ে যায়। আসলে আমরা ১০ টাকাও পাই না। খালি নেতারা পায়। বড় লোকেরা বড় লোকের পেট ভরায়, আমাগো আর ভরায় না। ওই ইলেকশনের সময় আসলে আবার আমাগো কাছে আসবে। এলাকার নেতাপ্যাতা বহুত কিছু বলছে, কিছুই দেয়নি। আসলে কিছু পাই না। বড় লোক বড় লোকের প্যাট ভরে।’

ফাতেমা এভাবে ক্ষোভ ঝাড়তে ঝাড়তে বলে ওঠেন, তাঁদের কেউ দেখে না, কারণ তিনি গরিব। ফাতেমা আরও বলেন, ‘বড় লোক মানুষ কী আর গরিবগো দ্যাখবে?’ ফাতেমা যে এলাকায় বসবাস করেন, সেই এলাকার কাউন্সিলর হলেন শাহজালাল বাদল। ফাতেমার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে বাদলের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। বাদল নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নূর হোসেনের ভাতিজা।