মাদক চোরাচালান

কোকেনের গন্তব্য অজানাই থাকে

পাচারে জড়িত আন্তর্জাতিক চক্রের কাউকে শনাক্ত করা যাচ্ছে না তদন্তে। ৫ বছরে সাতটি চালান ধরা পড়েছে।

চট্টগ্রামে একের পর এক কোকেনের চালান ধরা পড়েছে
ফাইল ছবি

চট্টগ্রামে একের পর এক কোকেনের চালান ধরা পড়লেও তদন্তে গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানো যাচ্ছে না। এতে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে পাচারে জড়িত দেশি–বিদেশি চক্র। শুধু বাহককে আসামি করে মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্যরা শনাক্ত না হওয়ায় কোকেন পাচারের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম জিয়া উদ্দিন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, চালানগুলোর গন্তব্য নির্ধারণ এবং জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। না হলে তারা এ ধরনের অপরাধ বারবার করবে। এতে ক্ষতি হবে দেশের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে চট্টগ্রাম। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ইয়াবা পাচার হয় সারা দেশে। এ কারণে চট্টগ্রামে প্রতিদিনই ইয়াবা ধরা পড়ছে। নগরের ১৬ থানায় প্রতিদিন হওয়া মামলার বেশির ভাগই ইয়াবা উদ্ধারের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দামি মাদক কোকেনও ধরা পড়ছে। সর্বশেষ ১২ আগস্ট চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো ধরা পড়েছে ফেনইথাইলামিন নামের এক বিশেষ ধরনের মাদক, যা দেখতে কোকেনের মতো। তবে এটি কোকেনের চেয়ে দামি। নগরের খুলশী ফয়’স লেক এলাকা থেকে এগুলো উদ্ধার করে র‍্যাব। একই সঙ্গে ফিরোজ খান নামের (৪০) এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লে কর্নেল মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে প্রথমবারের মতো মাদকটি ধরা পড়েছে। এটি দেখতে কোকেনের মতো। চট্টগ্রামে মাদকের একটি চালান আসছে খবর পেয়ে ফয়’স লেক এলাকা থেকে ফিরোজকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে ৭৭৫ গ্রাম ফেনইথাইলামিন পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে ফিরোজ জানিয়েছেন, মো. আজিজ নামের এক ব্যক্তি তাঁকে এগুলো দিয়েছেন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে ফেনইথাইলামিন মাদকদ্রব্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। উদ্ধার হওয়া মাদকের মূল্য ১২ কোটি টাকা।

ফেনইথাইলামিন উদ্ধারের ঘটনায় নগরের খুলশী থানায় র‍্যাব মামলা করেছে। আসামি ফিরোজকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। জানতে চাইলে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা খুলশী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন বলেন, চার দিনের রিমান্ডে ফিরোজ কিছুই জানে না জানিয়েছেন। তাঁকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাদকটি কে বা কারা এনেছে, গন্তব্যে কোথায়—কিছুই জানা যায়নি।

কোকেনের সবচেয়ে বড় চালান ধরা পড়ে চট্টগ্রাম বন্দরে। ঘটনাটি ২০১৫ সালের ৬ জুন। সূর্যমুখী তেলের চালান জব্দ করে ১০৭টি ড্রামের মধ্যে একটি ড্রামের নমুনায় কোকেন শনাক্ত হয়। জব্দ করা ৩৭০ লিটার কোকেনের মূল্য ৯ হাজার কোটি টাকা। তরল কোকেনকে গুঁড়া বা পাউডার কোকেনে রূপান্তর করার মতো প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে নেই।

কোকেনের সবচেয়ে বড় চালান ধরা পড়ে চট্টগ্রাম বন্দরে। ঘটনাটি ২০১৫ সালের ৬ জুন। সূর্যমুখী তেলের চালান জব্দ করে ১০৭টি ড্রামের মধ্যে একটি ড্রামের নমুনায় কোকেন শনাক্ত হয়। জব্দ করা ৩৭০ লিটার কোকেনের মূল্য ৯ হাজার কোটি টাকা। তরল কোকেনকে গুঁড়া বা পাউডার কোকেনে রূপান্তর করার মতো প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে নেই। এ চালানটি উরুগুয়ের মন্টিভিডিও থেকে জাহাজীকরণ করা হয়। পরে তা সিঙ্গাপুর হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে।

এ ঘটনায় দুটি মামলা বিচারাধীন। মামলা দুটির তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন ফারুকী প্রথম আলোকে বলেন, চালানটির গন্তব্য জানা যায়নি।

বড় চালানটির পর গত পাঁচ বছরে (২০১৫ জুন থেকে চলতি বছরের ১২ আগস্ট) পর্যন্ত সাতটি চালান ধরা পড়ে। একটিরও গন্তব্যে তদন্তে বেরিয়ে আসেনি। সব কটিতে আসামি বাহক। গত বছরের নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে ১৭ দিনের ব্যবধানে কোকেনের দুটি চালান ধরা পড়ে। এর মধ্যে একটি মামলায় শুধু বাহককে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। আরেকটি র‍্যাব তদন্ত করছে। গত বছরের ২৬ নভেম্বর নগরের হালিশহর বড়পোল এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৬ কোটি টাকা মূল্যের এক কেজি কোকেনসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আর কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। কোকেনগুলোর গন্তব্যে জানা যায়নি।

দেশে কোকেন সেবন করার মতো লোক নেই। দু-একজনের সামর্থ্য থাকলেও তারা আসক্ত নয়। ট্রানজিট হিসেবে চট্টগ্রামে কোকেনগুলো আসে। সেখান থেকে অন্য দেশে পাচার হয়।
এম এমদাদুল হক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মাদকবিষয়ক গবেষক

চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি নগরের কোতোয়ালি টাইগারপাস এলাকা থেকে ৮২০ গ্রাম কোকেনসহ বখতেয়ার হোসেন (৩২) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় করা মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের সহকারী পুলিশ সুপার তারেক আজিজ। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া আসামির কাছ থেকে দুজনের নাম পাওয়া গেছে। তাদের ধরার চেষ্টা চলছে। ওই দুজনকে ধরা গেলে হয়তো কোকেনের গন্তব্যে জানা যাবে।

চট্টগ্রামকে মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা ব্যবহার করে থাকে বলে মনে করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মাদকবিষয়ক গবেষক এম এমদাদুল হক। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, দেশে কোকেন সেবন করার মতো লোক নেই। দু-একজনের সামর্থ্য থাকলেও তারা আসক্ত নয়। ট্রানজিট হিসেবে চট্টগ্রামে কোকেনগুলো আসে। সেখান থেকে অন্য দেশে পাচার হয়। চট্টগ্রামকে যাতে পাচারকারীরা ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য সরকার কিংবা সংশ্লিষ্টরা জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থার (ইউএনওডিসি) সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেন এই গবেষক।