বাংলাদেশে ব্যবসা করার পরিবেশ আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। সহজে ব্যবসা করা যায় এমন ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৭৪, গত বছর এ অবস্থান ছিল ১৭২।
ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ নিয়ে করা বিশ্বব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস-২০১৬’ বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের এ চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৫ সালের ১ জুন পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য নিয়ে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। ২০০৩ সাল থেকে প্রতিবেদনটি বিশ্বব্যাপী নিয়মিত প্রকাশ হয়ে আসছে।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এবারের প্রতিবেদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। ব্যবসার পরিবেশকে ১০টি সূচকে ভাগ করে সেগুলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১০টি মূল সূচক হলো ব্যবসায় শুরু, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি, বিদ্যুতের প্রাপ্যতা, সম্পত্তি নিবন্ধন, ঋণের প্রাপ্যতা, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, কর পরিশোধ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তির বাস্তবায়ন ও অসচ্ছলতা দূরীকরণ। এই ১০টি সূচকে বাংলাদেশের অর্জন ৪৩ দশমিক ১০ শতাংশ পয়েন্ট, গতবার তা ছিল ৪২ দশমিক ৭১। আগের চেয়ে বেশি নম্বর পেলেও অন্যান্য দেশ আরও দ্রুতগতিতে এগিয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে দেশ।
১০টি সূচক আলাদাভাবে বিবেচনায় নিলে এবার কোনোটিতেই উন্নতি করতে পারেনি বাংলাদেশ। পাঁচটি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে, আর বাকি পাঁচটিতে অবস্থান অপরিবর্তিত। বাংলাদেশ সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে আছে বিদ্যুৎ প্রাপ্যতা সূচকে। এ ক্ষেত্রে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৮৯, এবারও তাই আছে। এ ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তির বাস্তবায়ন, অসচ্ছলতা দূরীকরণ—চারটি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।
যে পাঁচ সূচকে সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে সেগুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে ব্যবসায় শুরু। এ সূচকে গতবার বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১১, এবার তা ছয় ধাপ কমে ১১৭ হয়েছে। ঋণের প্রাপ্যতা সূচকে ১২৮ থেকে পাঁচ ধাপ কমে ১৩৩ হয়েছে। সম্পত্তি নিবন্ধন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, কর পরিশোধ সূচকে গতবারের চেয়ে এক ধাপ করে পিছিয়েছে বাংলাদেশ।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। অষ্টম স্থানে রয়েছে আফগানিস্তান, বিশ্ব তালিকায় দেশটির অবস্থান ১৭৭। দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষস্থানে ভুটান, অবস্থান ৭১তম। এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মধ্যে নেপাল ৯৯, শ্রীলঙ্কা ১০৭, মালদ্বীপ ১২৮, ভারত ১৩০, পাকিস্তান ১৩৮তম স্থানে। সব সূচক মিলিয়ে এই আটটি দেশের গড় অবস্থান ১২৮।
ভারত ও শ্রীলঙ্কা ছাড়া বাংলাদেশসহ বাকি ছয় দেশের ব্যবসায় পরিবেশই তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। যেমন, দুই ধাপ পিছিয়ে পাকিস্তান ১৩৮তম অবস্থানে রয়েছে। ভুটান এক ধাপ পিছিয়ে ৭১তম স্থানে, নেপাল পাঁচ ধাপ পিছিয়ে ৯৯তম এবং মালদ্বীপ তিন ধাপ পিছিয়ে ১২৮তম স্থানে রয়েছে। তবে ভারত চার ধাপ এগিয়ে ১৩৪তম স্থানে এবং শ্রীলঙ্কা এগিয়েছে ছয় ধাপ। শ্রীলঙ্কার অবস্থান ১০৭তম।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সার্বিক ব্যবসা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্বব্যাংক বলেছে, এ অঞ্চলের আটটি দেশ গত এক বছরে নয়টি সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। আগের বছর এমন ছয়টি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ গত এক বছরে দুটি সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, মালদ্বীপ এ সময়ে একটি করে সংস্কার কার্যক্রম শেষ করেছে। ব্যবসা শুরু, কর পরিশোধ ও বিদ্যুৎ প্রাপ্তি নিশ্চিতে এক বছরে সংস্কার হলেও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তির বাস্তবায়ন ও অসচ্ছলতা দূরীকরণের ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্য-সংক্রান্ত মামলা ও বিরোধ নিরসনে বিশ্বের ২২টি দেশে এক হাজার দিনের বেশি সময় লাগে। এর মধ্যে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশ রয়েছে। এ অঞ্চলের একজন উদ্যোক্তাকে সম্পদের নিবন্ধন নিতে গড়ে সময় ব্যয় করতে হয় ৯৮ দিন, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে ব্যবসা করার জন্য সবচেয়ে ভালো দেশ সিঙ্গাপুর। এর পরের দুটি অবস্থানে আছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক। তালিকা অনুযায়ী ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে খারাপ দুটি দেশ হলো ইরিত্রিয়া ও লিবিয়া।
এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী একযোগে প্রকাশিত হয়েছিল বিশ্ব সক্ষমতা সূচক। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) তৈরি করা ওই প্রতিবেদনের পাশাপাশি ঢাকায় প্রকাশিত হয়েছিল দেশে ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে আরেকটি জরিপ। দেশীয় উদ্যোক্তাদের ওপর পরিচালিত জরিপভিত্তিক ওই প্রতিবেদনেও দেশে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ নিয়ে নানা সমস্যার কথা বলেছিলেন দেশের উদ্যোক্তারা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ৬২ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন দেশে ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ নেই, ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, ৮৪ থেকে ৯১ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেই সরকারি দপ্তরে ঘুষ দিতে হয়।