
করোনা–আতঙ্কের কারণে খুলনায় মশানিধন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এ কারণে নগরে বেড়ে গেছে মশার উপদ্রব। মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী। এখন করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
নগরবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের মে মাসের মাঝামাঝি থেকে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ শুরু হয়। আর ওই সময় থেকেই অন্যান্য জেলার মতো ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেয় খুলনা সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে এ বছরের অবস্থা ভিন্ন। ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখনো স্বাস্থ্য বিভাগ বা সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো প্রস্তুতি শুরু হয়নি। ফলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লে স্বাস্থ্য বিভাগকে হিমশিম খেতে হবে। সেই সঙ্গে কেউ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে করোনা–আতঙ্কে কাঙিক্ষত সেবা না পাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
এরই মধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসকসহ তিনজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে তাঁরা সুস্থ আছেন। খুলনায় গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২ হাজার ৯৫ জন। আর মারা যান ২৬ জন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত বছর প্রথমে মেডিসিন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আইসিইউ ভবনে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ১২০ শয্যা চালু এবং পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড খোলা হয়। কিন্তু এ বছর আইসিইউ ভবনে ফ্লু কর্নার এবং সন্দেহভাজন করোনা–আক্রান্ত রোগীদের ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফলে ওই ওয়ার্ড ডেঙ্গু রোগীর জন্য আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তবে অন্য একটি স্থানে ৫০ শয্যার একটি ওয়ার্ড প্রস্তুতির কাজ চলছে।
নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কয়েক দিন আগে হওয়া বৃষ্টির পানি এখনো অনেক নিচু জায়গায় জমে আছে। বিভিন্ন বাসাবাড়ির ছাদে, ফুলের টবে, বিভিন্ন স্থানে ডাবের খোলা, প্লাস্টিক ও মাটির পাত্রে একইভাবে পানি জমে আছে, যা ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননে সহায়ক। অসচেতনতা কিংবা অবহেলার কারণে এসব পানি রয়েই গেছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, সন্ধ্যার পর মশার যন্ত্রণায় টেকা দায় হয়ে পড়েছে। এমনকি দিনের বেলায়ও মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে হচ্ছে। সন্ধ্যার পর অ্যারোসল স্প্রে বা মশার কয়েল না জ্বালালে এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকা যাচ্ছে না।
নগরের নিরালা এলাকার বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, মশার উপদ্রব বাড়লেও মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। একদিকে যেমন সবাই করোনা নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন, অন্যদিকে মশার অত্যাচারে আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে ডেঙ্গু–আতঙ্ক। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে ডেঙ্গুর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে খুলনাতে ডেঙ্গু ছড়াতে বেশি দিন লাগবে না। মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি বলেও দাবি করেন তিনি।
মশা নিধন বিষয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আব্দুল আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় কয়েক দিন ধরে সব নালায় লার্ভাসাইট ও কালো তেল স্প্রে করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন প্রতিটি ওয়ার্ডে দুটি করে ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশক নিধন অভিযান চলমান আছে। কিছুদিনের মধ্যেই মশা নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হবে। এরপর নগরে মশার উপদ্রব কমে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
ডেঙ্গু নিয়ে যেমন প্রস্তুতি স্বাস্থ্য বিভাগের
গত বছর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার ব্যবস্থা ছিল। পাশাপাশি ওই হাসপাতলেই রাখা হয়েছিল ডেঙ্গু ওয়ার্ড। তবে এবার ওই বিষয়ে এখনো তেমন কোনো প্রস্তুতিই শুরু করেনি স্বাস্থ্য বিভাগ।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজিস্ট নেওয়াজ নওশের বলেন, হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে ডেঙ্গু রোগীদের রক্তের প্লাটিলেট পরীক্ষার রি-এজেন্ট নেই। বিষয়টি হাসপাতালের পরিচালককে জানানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক মো. রেজা সেকেন্দার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বর্তমানে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে ডেঙ্গু নিয়েও তাঁদের প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যে হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৫০০টি কিট (রি-এজেন্ট) কেনার প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কিটের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হচ্ছে। এ ছাড়া ৫০ শয্যার একটি আলাদা ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখার কাজ চলছে।
খুলনার সিভিল সার্জন সুজাত আহমেদ বলেন, গত বছরের কিছু কিট এখনো রয়েছে। সেগুলো ও নতুন আসা কিট প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য ১০০টি করে সরবরাহ করা হয়েছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ওয়ার্ড চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।