
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলাম লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রকৃতপক্ষেই মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি ও বাঙালি সংস্কৃতির বন্ধু ছিলেন। যত দিন বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা থাকবে, তত দিন অমর হয়ে থাকবেন তিনি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) মিলনায়তনে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী স্মরণসভায় অংশ নিয়ে বিশিষ্টজনেরা এসব কথা বলেছেন। এ স্মরণসভার আয়োজন করে গৌরব ৭১ নামের একটি সংগঠন।
গত ১৯ মে ভোরে লন্ডনের একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন ভাষা আন্দোলনের স্মরণীয় গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র রচয়িতা গাফ্ফার চৌধুরী। এই লেখক ও সাংবাদিকের বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। তাঁর স্মরণসভায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মুহাম্মদ সামাদ বলেন, ‘পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমরা কল্পনাও করতে পারিনি যে এই দেশে ওই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের জন্য যাঁরা কাজ করেছেন, লিখে মানুষকে সতর্ক ও উদ্বুব্ধ করে জীবন দিতে প্রস্তুত করেছেন, তাঁদের মধ্যে পথিকৃৎ সাংবাদিক হলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।’
মুহাম্মদ সামাদ বলেন, ‘দিনে দিনে মানুষের পশ্চাৎপদ হয়ে পড়ার বিরুদ্ধে এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি কলম ধরেছিলেন। তাঁর লেখা একুশে ফেব্রুয়ারির গানটি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে গেছে। গাফ্ফার চৌধুরী ৭০ টাকা বেতনে সাংবাদিকতার চাকরি শুরু করেছিলেন। তিনি সারা জীবন লিখে গেছেন। তাঁর কি চলেনি? এখন সব মানুষই সৎ না হয়ে প্রতিদিন সচ্ছল হতে চায়, জ্ঞান-বিদ্যা-প্রজ্ঞা না থাকলেও ধূর্ত-চালাক-লুটেরা হয়ে মানুষকে ঠকাচ্ছে। গাফ্ফার চৌধুরীর জীবন থেকে এসব বিষয়ে শিক্ষা নেওয়া আমাদের কাজ।’
বাংলাদেশ সব সময় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর চিন্তাচেতনার কেন্দ্রে ছিলেন বলে মন্তব্য করেন নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আজ অবধি লেখনী ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে একটা বিশাল ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশকে তিনি প্রতিমুহূর্তে বুঝতে পারতেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ও তুলনার ক্ষমতা ছিল অতুলনীয়। গান অমর, শহীদ মিনার অমর এবং গাফ্ফার চৌধুরীও আমাদের কাছে অমর হয়ে থাকবেন, যত দিন বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা থাকবে।
শারীরিকভাবে লন্ডনে অবস্থান করলেও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর অন্তর বাংলাদেশে থাকত বলে মন্তব্য করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের শেষ বাতিঘরকে হারিয়েছি। আরেকজন গাফ্ফার চৌধুরী কবে তৈরি হবে, তা আমরা জানি না। তাঁর লেখা অমর একুশের কালজয়ী গানটির আবেদন আজ বাঙালিদের পাশাপাশি অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষের মধ্যেও রয়েছে। যত দিন একজন বাঙালি বেঁচে থাকবেন, তত দিন এই গানটি বেঁচে থাকবে, তিনিও বেঁচে থাকবেন।’
গোলাম কুদ্দুছ আরও বলেন, স্ত্রী দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় ১৯৭৪ সাল থেকে গাফ্ফার চৌধুরী লন্ডনে অবস্থান করেছেন। শারীরিকভাবে লন্ডনে অবস্থান করলেও তাঁর অন্তর ছিল বাংলাদেশে। লন্ডনে থেকেও তিনি বাংলাদেশকে অনেক সঠিকভাবে অনুভব করতে পারতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন বাঙালিত্বে, বিশ্বাস করতেন মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টবাদী মানুষ ছিলেন। তিনি সমালোচনা করতেও ছাড়তেন না, তবে কুৎসা রটনা করতেন না।
স্মরণসভায় অংশ নিয়ে জনকণ্ঠ–এর সাবেক নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায় বলেন, ‘১৫ আগস্টের পর আমরা এক সাহসী গাফ্ফার চৌধুরীকে পেয়েছিলাম। সে সময় লন্ডন থেকে বাংলার ডাক পত্রিকায় বঙ্গবন্ধু হত্যার চক্রান্ত, এই হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত, প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি এসব লিখতেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তাঁর লেখা ওই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে। তাঁর লেখার ভেতর দিয়েই স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপপ্রচারগুলোর জবাব শুরু হয়।’
স্মরণসভার শুরুতে প্রয়াত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয় গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা অমর একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।’ গৌরব ৭১-এর সাধারণ সম্পাদক এফ এম শাহীনের সঞ্চালনায় স্মরণসভায় অন্যান্যের মধ্যে সংগঠনের সভাপতি এস এম মনিরুল ইসলাম বক্তব্য দেন।