সরকার ও বিরোধী দলের দুই নারী সাংসদের বক্তব্যে অধিবেশন কক্ষে উত্তাপ। পরে ওয়াকআউট করেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা

চরিত্র নিয়ে কুৎসা

বাজেট আলোচনা
বাজেট আলোচনা

বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া এবং তাঁর মায়ের চরিত্র নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করেন সরকারদলীয় সাংসদ অপু উকিল। খালেদা জিয়ার নিজের ও তাঁর সন্তানের পিতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। অপু উকিল গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, খালেদা জিয়ার মা লক্ষ্মী রানী মারমা দার্জিলিংয়ের চা-বাগানের মালিক উইলসনের ‘চাকরানি’ ছিলেন। পাকিস্তানের সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের ইন্দো-পাকিস্তান ওয়ার অব ১৯৬৫ বইটির বরাত দিয়ে তিনি এসব বক্তব্য দেন। বক্তব্য দেওয়ার সময় লাল মলাটের বইটি তুলে ধরে প্রদর্শন করেন তিনি। এ সময় বিএনপি ও জামায়াতের সাংসদেরা তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং সমস্বরে ‘ছি ছি’ ধ্বনি দেন। আর সরকারি দল টেবিল চাপড়ে উৎসাহ দেয় অপু উকিলকে। সংসদ নেতা শেখ হাসিনা তখন অধিবেশনকক্ষে ছিলেন না। বিএনপির সাংসদেরা অপু উকিলের মাইক বন্ধ করে দেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে দাবি জানান। অপু উকিল বক্তব্য অব্যাহত রাখলে রাত আটটা ৫৭ মিনিটে জমির উদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় সাংসদেরা ওয়াকআউট করেন। এ সময় ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন। গতকাল স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। রাত আটটার পর ডেপুটি স্পিকার আসেন। তখন বিএনপির নিলোফার চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের অপু উকিলের বক্তব্যে সংসদ হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নিলোফার প্রথমে বাজেটের ওপর আলোচনার সুযোগ পেয়ে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও শেখ হাসিনার পরিবার-পরিজন সম্পর্কে বক্তব্য দিলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ডেপুটি স্পিকার উভয়কে বাজেটের ওপর বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ করলেও তাঁরা কর্ণপাত করেননি। এরপর অপু উকিল খালেদা জিয়ার পরিবার সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে অপু উকিল আরও বলেন, খালেদা জিয়া ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ঘরে জন্ম নিয়েও সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার করছেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে হিন্দুদের বাড়িঘর ভাঙছেন।

নিলোফার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী নাকি দিনের ১২টায় ঘুম থেকে ওঠেন। আরও কিছু শব্দ বলেছেন তিনি, যা তাঁর জন্যও শরম, বিরোধীদলীয় নেত্রীর জন্যও লজ্জা। বিরোধীদলীয় নেত্রী তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন। কোরআন তিলাওয়াত করেন। খতমে তারাবিহ পড়েন। আমরা লোক দেখানো নামাজ পড়ি না। স্কাইপের বিচারকের ভাষায় বলতে হয়, “সরকার গেছে পাগল হইয়া”।’

নিলোফার বলেন, ন্যূনতম মজুরির জন্য নিহত হন আমিনুল ইসলাম। টিপাইমুখের জন্য গুম হন ইলিয়াস। এই সরকারের সময় ৯৮ হাজার ১৮৪ জন খুন, গুম ও অপহূত হয়েছেন। তিনি বলেন, এক ভাড়াটে মন্ত্রী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া সম্পর্কে কুৎসিত মন্তব্য করেছেন। তিনি পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার এবং এম এ ওয়াজেদ মিয়ার বই উদ্ধৃত করে বলেন, তাঁরা স্বীকার করেছেন, জিয়া প্রকৃত স্বাধীনতার ঘোষক।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল উল্লেখ করে নিলোফার বলেন, ‘এটা সরকারের চার বছরের আমলনামা। নির্যাতনের ফল। এখনো সময় আছে, ভালোয় ভালোয় বিদায় হোন।’

বিএনপির শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, তারেক রহমান জিয়াউর রহমানের ডুপ্লিকেট, তারেক রহমান একটি ইনস্টিটিউট। তারেক রহমান দেশে আসবেন, এই অচল বাংলাদেশ সচল হবে। দুঃশাসনের রাজনীতি সুশাসনে পরিণত হবে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের প্রশংসা করে শহীদ উদ্দীন বলেন, তিনি ১২টি বাজেট দিয়েছিলেন। ভ্যাট তাঁর যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সাইফুর রহমানের আমলে শেয়ার মার্কেটে ধস নামেনি। কিন্তু আওয়ামী লীগের আমলে ’৯৬ সালে এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রীর আমলে শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধস হয়েছে। ৩৫ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বসে পড়েছেন। ৮৪ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে লোপাট হয়ে গেছে।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বাজেট আলোচনায় বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট আওয়ামী লীগের লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘যারা বলেছিল আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে ইসলাম থাকবে না, যুক্তফ্রন্টে ভোট দিলে বউ থাকবে না, তাদের মুখ লুকানো উচিত। তারা দেখুক, আমরা কী করেছি।’

মাদ্রাসাশিক্ষার উন্নয়নে সরকারের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে নাহিদ বলেন, ‘যারা আল্লাহর আইন কায়েম করতে চেয়েছিল, তারা মাদ্রাসাশিক্ষার জন্য কী করেছে? আমরা এক হাজার মাদ্রাসা ভবন নির্মাণ করেছি। ৩৫টি মডেল মাদ্রাসা করেছি। ৩১টি মাদ্রাসায় অনার্স (সম্মান) কোর্স চালু করেছি। স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন সমান করা হয়েছে। আমরা ইসলামিক অ্যারাবিক বিশ্ববিদ্যালয় করব, আইন হয়ে গেছে।’

আওয়ামী লীগের টিপু মুনশি উত্তরাঞ্চলে গ্যাস-সংযোগ দাবি করে বলেন, গ্যাস-সংযোগ হলে তিনি নিজেই ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। তিনি দেশে পোশাক খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কিছু পরিকল্পনা নেওয়ার কথাও বলেন।

সরকারি দলের ফজলে নূর তাপস বলেন, যারা যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে ইসলামের নামে জঘন্য কাজ করে, কোরআন পোড়ায়, তারা নাস্তিক নয়, মুরতাদ নয়; তারা কাফের।

জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া বলেন, কালোটাকা আর অপ্রদর্শিত আয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। কালোটাকা সাদা করতে হলে ৫০ শতাংশ জরিমানা করা উচিত। আর ব্যবসায়ীদের কাছে নানা কারণে অপ্রদর্শিত আয় থাকে। সেই টাকা সাদা করতে ৫ শতাংশ হারে কর প্রদানের সুযোগ তৈরির প্রস্তাব করেন তিনি। তিনি বলেন, মূলত ধনিক ও ব্যবসায়ীদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এ বাজেটে।

বাজেটের ওপর আরও আলোচনা করেন আবদুল লতিফ বিশ্বাস, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, কাজী কেরামত আলী, শফিকুর রহমান চৌধুরী, গোলাম সবুর, শামসুর রহমান শরীফ, জাফর ইকবাল সিদ্দিকী প্রমুখ।