
ছোটবেলায় তীব্র ডায়রিয়া হলো। চলে গেল দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি। তরুণ বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পা হারালেন। এত কষ্টের জীবনে তবু সোভাময় দেওয়ানের বাঁশির সুর নষ্ট হয়নি। কণ্ঠও ছিল সচল। তাতে সুর মিলিয়ে হাট-বাজারে মানুষকে গান শোনাতেন, বাঁশিও বাজাতেন। অভাবের সংসার চলত সুরে-কষ্টে-গানে। কিন্তু মহামারি করোনায় হাট-বাজার তো বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কঠোর বিধিনিষেধে দোকানপাটও অনেকে বন্ধ করে দিয়েছেন। পার্বত্য জেলা রাঙামাটি শহরের কল্যাণপুরের বাসিন্দা সোভার সংসার আর চলে না। তিন সন্তান আর স্ত্রী নিয়ে বড় বিপাকে পড়েছেনএই শিল্পী। যিনি ছোটবেলায় রাখাল ছেলেদের কষ্ট নিয়ে চাকমা ভাষায় গান লিখেছিলেন। করোনায় তাঁর জীবনের সুর প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
সোভাময়ের গ্রামের বাড়ি রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায়। সাত বছর বয়স যখন, তখন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। এরপর দৃষ্টিশক্তি হারাতে থাকেন। লেখাপড়া আর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু গানের প্রতি ছিল তীব্র আসক্তি। প্রথমেই ধরেন বাঁশি। নিজেই শিখেছিলেন বাবার কিনে দেওয়া বাঁশি। হারমোনিয়ামের প্রতি আকর্ষণ ছিল। কিন্তু অত ছোট ছেলেকে কে হারমনিয়াম দেবে?
সোভাময় বলেন, ‘একসময় ঠিক করলাম, বাঁশি বাজিয়ে টাকা রোজগার করে একদিন হারমোনিয়াম কিনব। একসময় তা–ও কিনেছিলাম। এভাবেই বাঁশি আর গান গাওয়া জীবনে উপার্জনের পথ হয়ে গেল।’
ছেলের কী হবে, এই ভেবে ব্যাকুল বাবা সোভাময়কে সেই ছোটবেলায় রাঙামাটির রাজবন বিহারে বৌদ্ধ ধর্মগুরু বনভান্তের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। বনভান্তে বলেছিলেন, ছেলে নিজের পথ নিজেই করে নেবে।
সোভাময় বেঁচে থাকার জন্য সঙ্গীতেই ভরসা করেছিলেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতেন। রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন দোকান বা বাজারে বাঁশি বাজাতেন। হাটের দিন শহরের বাইরে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি, গিলাছড়ি, কুতুকছড়িতে চলে যেতেন। ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হতো। এতে সংসার চলত কোনোক্রমে।
২০০৪ সালে রাঙামাটি থকে খাগড়াছড়িতে বাসে যাচ্ছিলেন। বাস খাদে পড়ে গেল। পা ভেঙে পঙ্গু হয়ে গেলেন সোভাময়। এরপর থেকে জীবনের অনুষঙ্গ হলো ক্রাচ।
তবুও জীবন থামেনি সোভাময়ের। বলছিলেন, ‘গান–বাজনা ছাড়িনি। কিন্তু বয়স যখন হচ্ছে, দুর্বল হয়ে পড়ছি। করোনা বয়স আরও বাড়িয়ে দিল।’
সোভাময়ের তিন সন্তান। দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলেটি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার পর আর লেখাপড়া করতে পারেনি। দিনমজুরির কাজ করে। মেয়ে একটি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। আর ছোট মেয়েটির বয়স প্রায় দুই বছর।
এর মধ্যে করোনা এসে সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায়। এবারের লকডাউনে সোভাময়ের কষ্ট দেখে স্থানীয় পুলিশের এক উপপরিদর্শক তাঁকে কিছু সহযোগিতা করেন, আবার সোভাময়ের গানের একটি ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করেন। সেটা দেখেই এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয়।
সোভাময় বলেন, ‘এখন কে সাহায্য করবে? দোকানপাট বন্ধ। কার কাছে চাইব? মানুষ তো অসুখ–বিসুখ নিয়ে ভয়ে আছে। দূরের বাজারে তো যেতে পারি না। শহরের অবস্থা আরও খারাপ। আমি গান ছাড়া কিছু তো পারিও না।’
বনরূপা বাজার, কলেজ গেটসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় এই পরিচিত মুখ এখন আর দেখা যায় না।
রাঙামাটির ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন জুম এসথেটিক কাউন্সিলের (জাক) সাধারণ সম্পাদক অম্লান চাকমা বলছিলেন, সোভাময়ের জীবনের বেঁচে থাকার উপায় ছিল সঙ্গীত। এই দুঃসময়ে তাঁর মতো অনেকের অবস্থা সঙিন। তাঁদের জন্য সরকারি সহায়তা দরকার।
গান শুনিয়ে অন্নের সংস্থান করা সোভাময়ও সহযোগিতা চান। তিনি যা পারেন, সেই গান তিনি ছাড়তে চান না। জীবনের পাথেয় হিসেবেই একে বিবেচনা করেন। চাকমা ভাষার জনপ্রিয় গান, বাংলা গান তাঁর প্রিয়। এর মধ্যে এসডি রুবেলের ‘ছোট জীবন আমার নাটকের মতো, সুখের অভিনয় করছি’ গানটি বড় প্রিয়। নিজের জীবনের সঙ্গে কোথাও একটা মিল খুঁজে পান গানটিতে।