পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় বেআইনিভাবে বিদ্যুতের নতুন ট্রান্সফরমারের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় দালাল চক্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে গ্রাহকেরা অভিযোগ করেছেন। এ বছর উপজেলার মাথাফাটা ও খয়খাটপাড়া গ্রামের বিকল ট্রান্সফরমার বদলানোর জন্য গ্রামবাসীকে টাকা দিতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।
পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের জুলাই মাসে তেঁতুলিয়া বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যালয়ের আওতায় তিন হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহক ছিলেন। এখন চার শতাধিক সেচপাম্পসহ বৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ আছে প্রায় সাত হাজার। ট্রান্সফরমার নষ্ট হলে নতুন ট্রান্সফরমার দিতে বা মেরামত করে দিতে পল্লী বিদ্যুতের টাকা নেওয়ার নিয়ম থাকলেও পিডিবির গ্রাহকদের কাছ থেকে তা নেওয়ার বিধান নেই।
খয়খাটপাড়া, শালবাহান, মাঝিপাড়া, আজিজনগর, ভজনপুর, মাথাফাটাসহ কয়েকটি গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমপক্ষে ১০ বাসিন্দা বলেন, গ্রাহকেরা কোনো সমস্যা নিয়ে বিদ্যুৎ কার্যালয়ে গেলে সেখানকার লোকজনই নির্দিষ্ট দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। দালালকে টাকা দেওয়ার পর নতুন ট্রান্সফরমার আসে। তবে বিদ্যুৎ কার্যালয়ের কেউ এ টাকা সরাসরি নেন না।
ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা বলেন, বিদ্যুৎ কার্যালয়কে কেন্দ্র করে পুরো উপজেলায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। তাঁদের মধ্যে তেঁতুলিয়ার মিলন ইসলাম, তালারাম জোত গ্রামের আইবুল হোসেন, কালান্দিগঞ্জের আলম হোসেন ও আজিজ নগরের মনিরুজ্জামান অন্যতম।
তবে মিলন ইসলাম বলেন, ‘আমি পিডিবি অফিসে যাই। কেউ ডাকলে তাঁর কাজও করে দিই। তখন কেউ খুশি হয়ে কিছু দিলে নিই। কিন্তু দালালি করি না।’
আইবুল হোসেন বলেন, ‘আমি বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক সমস্যা মেরামতের কাজ করি। এরই সূত্র ধরে বিদ্যুৎ কার্যালয়ে আমার যাতায়াত ও জানাশোনা। গ্রামের মানুষেরা জানে না কোন কাজ কীভাবে করতে হবে। তাই বিদ্যুৎ অফিসের কোনো কাজ হলে আমি তাদের পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করি। পরে মেরামতের কাজও করে দিই। তখন গ্রামবাসী খুশি হয়ে কিছু টাকাপয়সা দেন।’
সরেজমিনে জানা যায়, ৩ নম্বর তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের মাথাফাটা গ্রামে ১৯৮২ সালে বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া হয়। এ গ্রামের আয়ুব আলী (৪৫) বলেন, এখন গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে। বৈদ্যুতিক তারগুলোও পুরোনো হয়ে গেছে। প্রায়ই বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ কম ভোল্টেজের সমস্যা দেখা দেয়। নতুন ট্রান্সফরমার দিতে ও বিদ্যুৎ লাইনটি মেরামতের জন্য বহুদিন ধরে এলাকার লোকজন নানাভাবে তেঁতুলিয়া বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আয়ুব আলী নিজেও যান ওই কার্যালয়ে। শেষ পর্যন্ত চার-পাঁচ মাস আগে কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা এক দালাল পাঠান তাঁর কাছে। ট্রান্সফরমারটি মেরামতের জন্য দালাল মারফত বিদ্যুৎ কার্যালয় থেকে ৭০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে।
একই গ্রামের টুপি কারখানার মালিক হারুন অর রশিদ বলেন, আয়ুব আলীর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কার্যালয়ের টাকা চাওয়ার বিষয়টি জেনেছেন। বিদ্যুৎ সমস্যায় তাঁর কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু এত টাকা তো তাঁর একার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। গ্রামবাসী সবাই মিলে দিলে তিনিও দিতেন বলে জানান এ কারখানার মালিক।
তিরনইহাট ইউনিয়নের খয়খাটপাড়া গ্রামের ট্রান্সফরমারটি গত ২৫ জুলাই নষ্ট হয়। গ্রামের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য জাকির হোসেন বলেন, গত বছরও তাঁদের গ্রামের ট্রান্সফরমারটি নষ্ট হয়েছিল। তখন ৫০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। তবে গ্রামবাসী ২০ হাজার টাকা দেন। তারপর বিদ্যুৎ কার্যালয় থেকে পুরোনো একটি ট্রান্সফরমার লাগিয়ে দিয়ে যাওয়া হয়। এ বছর বিদ্যুৎ কার্যালয়ের লোকেরা ৭০ হাজার টাকা চেয়েছেন। দালালের মাধ্যমে টাকাটা চাওয়া হয়েছে। তাই গ্রামের প্রত্যেক বাড়ি থেকে ৫০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে কমিটিতে।
তেঁতুলিয়া বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের আবাসিক কর্মকর্তা মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘ট্রান্সফরমার বাবদ টাকা নেওয়ার নিয়ম নেই। তারপরও দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেকে টাকা দিচ্ছেন বলে আমরা শুনেছি। গ্রাহকদের আমরা সব সময় বিদ্যুৎ কার্যালয়ে সরাসরি যোগাযোগ করতে বলি। কিন্তু তাঁরা দালালদের দ্বারস্থ হলে আমাদের কিছু করার থাকে না।’