মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে: রাশেদ খান মেনন

ট্রেড ইউনিয়ন করার বিধান রেখে শ্রম আইন সংশোধন

শিল্প-কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের বিধান রেখে গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল-২০১৩ পাস হয়েছে। তবে পাস হওয়া আইনে পোশাক খাতের ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত শিথিল করা হয়নি। আবার সংশোধিত আইনে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) ট্রেড ইউনিয়নের কোনো বিধান রাখা হয়নি। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানিতে শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ নয় মাস হলেই সেই শ্রমিক প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচিত হবেন। বিলে শ্রমিকদের জন্য গ্রুপ বিমাসহ অন্যান্য সুবিধা এবং মালিকপক্ষের জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছে। সংসদে অনুপস্থিত থাকায় বিলের ওপর বিরোধী দলের দেওয়া জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানো ও সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপিত হয়নি। মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বিলের ওপর জনমত যাচাই এবং সংশোধনী প্রস্তাব দিলেও মন্ত্রী তা গ্রহণ করেননি। তবে জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক ও আওয়ামী লীগের জুনাইদ আহমেদের ১২টি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। বিল-সম্পর্কিত সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে রাশেদ খান বলেন, এ আইন না শ্রমিক, না বিদেশিদের সন্তুষ্ট করবে। প্রকৃত অর্থে এ আইনের মাধ্যমে মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে। 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনা করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন শ্রম আইনে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত শিথিল করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু গতকাল যে বিল পাস হয়েছে, তাতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের আগের বিধান বহাল রাখা হয়েছে।বিদ্যমান আইনের ১৭৯ ধারায় বলা আছে, কোনো প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত মোট শ্রমিক সংখ্যার ন্যূনতম ৩০ শতাংশ সদস্য ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য না হলে সেই ট্রেড ইউনিয়ন এ আইনের অধীনে নিবন্ধন পাওয়ার যোগ্য হবে না। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এ সংখ্যা ১০ শতাংশ করার সুপারিশ করেছিল। কারণ, বিভিন্ন পোশাকশিল্প কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের ৩০ শতাংশকে ইউনিয়নের সদস্য করা প্রায় অসাধ্য কাজ।জানতে চাইলে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল পোশাকশিল্প কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের বিষয়টি আইনে স্পষ্ট করা। সেটা করা হয়নি। সরকারি আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করার দাবি ছিল। সেটা চার মাস বহাল রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকার মালিকপক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে আইন করেছে।’ উল্লেখ্য, শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা বা জিএসপি স্থগিত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইপিজেডেও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।  বিলের ওপর আলোচনায় মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ বিলের ওপর জনমত যাচাইয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, অনেক আলাপ-আলোচনার পর বিলটি আনা হয়েছে। বিরোধী দলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আইনটি পাস করলেও সে সময় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৫৬টি সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সেগুলো গ্রহণ করেনি। বরং সে সময় শ্রমিকদের ওপর হত্যা-নির্যাতন চালানো হয়েছিল। আর এখন তাদের একজন হেফাজতের আমির আল্লামা শফী পোশাকশিল্পে নারীদের কাজ না করার সবক দিচ্ছেন। আর বিরোধীদলীয় নেত্রী জিএসপি বাতিলের সুপারিশ করেছেন। মন্ত্রী আরও বলেন, এ আইন পাস হলে শ্রমিকদের দীর্ঘ দিনের দাবি পূরণ হবে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থগিত করা জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে। বিলে আরও বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানিতে শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ নয় মাস হলেই সেই শ্রমিক প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচিত হবেন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রমিকদের জন্য গ্রুপ বিমা থাকবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ১০০ জন শ্রমিক রয়েছেন, সেসব প্রতিষ্ঠানে এ বিমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শ্রমিকের মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিমা দাবি আদায় মালিকের দায়িত্ব হবে এবং মালিক ওই বিমা দাবি থেকে আদায় করা অর্থ পোষ্যদের সরাসরি দেবেন অথবা শ্রম আদালতে পাঠাবেন।

বিলে বলা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে পাঁচ হাজার বা তার বেশি শ্রমিক কাজ করেন, সেখানে স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পেশাগত রোগে আক্রান্ত শ্রমিকদের সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত মালিকের দায়িত্বে চিকিৎসা করতে হবে। এ ছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানে ৫০০ বা তার বেশি শ্রমিক কাজ করেন, সেখানে প্রতিষ্ঠান কল্যাণ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। বিলে প্রসূতিকল্যাণে বাধা দেওয়া মালিকের অর্থদণ্ড পাঁচ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। বিলে প্রধান কারখানা পরিদর্শককে কারখানা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, অনুমোদিত কারখানা ভবনের নকশার সঙ্গে কারখানার মেশিন স্থাপনের নকশার কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন ঘটানো যাবে না। কাজ চলার সময় প্রতিষ্ঠানের বাইরে যাওয়ার কোনো দরজা বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।পাস হওয়া বিলে জাহাজ নির্মাণ, জাহাজভাঙা, ওয়েল্ডিং মোবাইল অপারেটর কোম্পানি, বেসরকারি রেডিও, টেলিভিশন, হাসপাতালসহ কৃষি শ্রমিকদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সবশেষে সংসদের অধিবেশন আজ বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।