
ট্রেনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার টিকিট সংগ্রহের জন্য গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের কাউন্টারগুলোতে যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। যাঁরা সড়কপথে বাড়ি ফিরবেন বলে ট্রেনের আগাম টিকিট কাটেননি, তাঁদের বড় একটি অংশ ভিড় করেন স্টেশনে। ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কপথে দীর্ঘ যানজটের কারণে গতকাল ট্রেনে যাত্রীদের চাপ বেশি ছিল।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রতিটি ট্রেন নির্ধারিত সূচি মেনে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায় বলে জানান রেলওয়ের কর্মকর্তারা। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করা বিরতিহীন আন্তনগর ‘সুবর্ণ এক্সপ্রেস’ ও ‘সোনার বাংলা’ ছাড়া অন্য ট্রেনগুলো নির্ধারিত আসনের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি যাত্রী পরিবহন করেছে। ট্রেনে গাদাগাদি করে গেলেও প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করবেন এই আনন্দে যাত্রাপথের কষ্ট নিয়ে যাত্রীদের তেমন কোনো অভিযোগ ছিল না।
চট্টগ্রাম স্টেশনে ভিড় থাকলেও ঢাকাগামী যাত্রীদের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল বলে জানান রেল কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, ফেনী, লাকসাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোর যাত্রী বেশি ছিল।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা সরদার সাহাদাত আলী প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম স্টেশনের প্রতিটি ট্রেন শিডিউল (সূচি) অনুযায়ী চলছে। ঈদের যাত্রার কারণে দুটি বিরতিহীন ট্রেন ছাড়া বাকি আটটি আন্তনগর ও সাতটি মেইল-এক্সপ্রেস ট্রেন এবং চাঁদপুরগামী বিশেষ দুটি ট্রেনে স্ট্যান্ডিং টিকিট ছাড়া হয়। সড়কপথে যানজটের কারণে ট্রেনে ভিড় বেশি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে গতকাল বেলা তিনটায় মহানগর গোধূলীতে বাড়ি যাচ্ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সোহেল রহমান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী তিনি। দাঁড়িয়ে যাওয়ার টিকিট সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই তিনি স্টেশনে হাজির হন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ট্রেনে যেতে চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা লাগতে পারে। দাঁড়িয়ে গেলেও কষ্ট হবে না।’
গতকাল বিকেলে স্টেশনের কাউন্টারে অপেক্ষমাণ যাত্রী সাব্বির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সড়কপথে ঢাকা যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। গোমতী সেতু থেকে ঢাকা পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে বলে টিভির খবরে দেখলাম। তাই ট্রেনে যাচ্ছি।’
চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুরগামী দুটি বিশেষ ট্রেনে করে যাত্রী পরিবহন শুরু হয়েছে গতকাল। বৃহত্তর বরিশাল ও আশপাশের অঞ্চলের ঘরমুখী মানুষ এই ট্রেনে চড়ে চাঁদপুর পর্যন্ত যাচ্ছে। এরপর সেখান থেকে স্টিমার বা লঞ্চে চড়ে তাঁরা নির্ধারিত গন্তব্যে যাচ্ছেন। গতকাল চাঁদপুরগামী দুটি ট্রেনে নির্ধারিত আসনের বিপরীতে প্রায় তিন গুণ যাত্রী পরিবহন করেছে।
চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুরগামী বিশেষ ট্রেনের আসন সংখ্যা ৪৫০টি। কিন্তু গতকাল সকালে ১ হাজার ২৭০ জন এবং বিকেলে ১ হাজার ২৯৩ জন যাত্রী পরিবহন করেছে ট্রেনটি। রেলের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘চাঁদপুরগামী বিকেলের বিশেষ ট্রেনে টিকিট করেও অনেক যাত্রী নিজ আসনে বসতে পারেননি। আমরা রেলের নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে কিছু যাত্রীকে আসনে বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’
গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুরগামী মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেনে নির্ধারিত আসনের চেয়ে তিনগুণ বেশি যাত্রী ওঠে। যাত্রীর চাপে একপর্যায়ে ট্রেনটির দুটি বগি কাত হয়ে যায়। পরে কিছু যাত্রী নামিয়ে দিয়ে ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে যায়।
চাঁদপুরগামী মেঘনা ট্রেনের যাত্রী আবদুর রহিম গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, দাঁড়িয়ে যাওয়ার টিকিট কিনেছেন তিনি। কিন্তু প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে ট্রেনের বগির ভেতরে ঢুকতে পারছেন না। এখন ছাদে ওঠা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় নেই।
চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে সিলেটগামী পাহাড়িকা ও ঢাকাগামী চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনও গতকাল দ্বিগুণ এবং ময়মনসিংহগামী বিজয় এক্সপ্রেস আসনের বিপরীতে আড়াই গুণ যাত্রী পরিবহন করেছে।
যাত্রীদের অস্বাভাবিক ভিড়ের মধ্যেও ঢাকাগামী ‘সোনার বাংলা’ ট্রেন ছিল ব্যতিক্রম। গতকাল ৫৯৯ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ট্রেনটি চট্টগ্রাম স্টেশন ছেড়ে যায় বলে জানায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। যদিও এই ট্রেনের আসনসংখ্যা ৭০৪টি। সোনার বাংলায় ১০৫টি টিকিট অবিক্রীত ছিল। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী যাত্রীর চাপ কম থাকা এবং এই ট্রেনের ভাড়া বেশি হওয়ায় এ অবস্থা হয়েছে বলে জানান রেল কর্মকর্তারা।
কদমতলী টার্মিনাল: চট্টগ্রাম নগরের কদমতলী টার্মিনালে গতকাল ঘরমুখী মানুষের তেমন ভিড় দেখা যায়নি। এই টার্মিনালে আগাম টিকিট বিক্রি হয় না। বৃহত্তর নোয়াখালী ও কুমিল্লার ২২ রুটের গাড়ি এই টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যায়।
নোয়াখালীর সোনাপুর রুটের একটি গাড়ির সহকারী মোস্তাক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, যাত্রীর ভিড় কম।
চট্টগ্রাম আন্তজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিভি ও পত্রিকায় মহাসড়কের যানজটের খবর ফলাও করে প্রচার হচ্ছে। এ কারণে বাস টার্মিনালের পরিবর্তে যাত্রীরা ট্রেন স্টেশনের দিকে যাচ্ছে।’