দুধের জন্য কাঁদছে ছোট্ট অপ্সরী

‘মেয়ের জন্মের পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছিলাম, “ও আমার অপ্সরী”। সেই থেকে আমার মেয়ের নাম হয়ে গেছে অপ্সরী। ও এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করছে। কিন্তু খাবার ছাড়া ও কত দিন বাঁচতে পারবে?’

হাসপাতালে ভর্তি ৪১ দিন বয়সী মেয়েকে নিয়ে এই দুশ্চিন্তা বাবা কামরুল হাসানের। নির্ধারিত সময়ের আগে সাত মাসেই পৃথিবীতে এসেছে ছোট্ট অপ্সরী। এতটুকু শিশুকে মায়ের বুকের দুধ ছাড়া অন্য কোনো খাবার দিতে রাজি নন চিকিৎসকেরা। কিন্তু অপ্সরীর মা একধরনের বাত লুপাস (এসএলই) রোগে আক্রান্ত। সুস্থতার জন্য এই মাকে বিশেষ কিছু ওষুধ খেতে হয়। এ জন্য তিনি মেয়েকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না। এতে ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছে অপ্সরী। দুধের জন্য ক্ষণে ক্ষণে কাঁদছে সে।

মেয়ের জন্ম হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। নবজাতক নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে রয়েছে সে। চারপাশে সদ্যোজাত সন্তানদের বুকের দুধ খাওয়ান মায়েরা। আর অপ্সরী তখন ক্ষুধায় কাঁদে। নবজাতক ইউনিটের মায়েদের পাশে অসহায়ের মতো ফিডার হাতে একটু দুধের জন্য ঘুরে বেড়ান অপ্সরীর দাদি ও নানি। কোনোদিন মায়েরা সদয় হন, কোনোদিন হন না। এতে ৪১ দিনের অপ্সরীকে কোনো বেলা আধপেটা, কোনো বেলা না খেয়ে থাকতে হয়।

বাবা বলেন, ‘আমার ৪১ দিনের মেয়েটা দুপুরেও না খেয়ে ছিল। ১ কেজি ৫০ গ্রাম ওজনের মেয়েটাকে রাতের বেলাতেও প্রায়ই না খেয়ে থাকতে হয়। অথচ যে মায়েরা আছেন, তাঁরা যদি এক মিলিলিটার করেও দুধ দেন তো আমার মেয়েটাকে আর না খেয়ে থাকতে হয় না।’

‘একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর কিছুতেই খুঁজে পান না বাবা। নিজের সন্তানের পাশাপাশি আমার মেয়ের জন্য একটু দুধ দিলে কী এমন ক্ষতি হবে এই মায়েদের? এই মায়েরা কী সত্যিকারের মা হয়ে উঠতে পারেন না?’

তবে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে থাকা মায়েরা বড় স্বার্থপর। তাঁরা ভাবেন, অন্যের সন্তানকে দুধের ভাগ দিলে নিজের সন্তানটি দুধ পাবে না। তাই অপ্সরীর দাদি বা নানির হাতে ফিডার দেখলেই বিরক্ত হন তাঁরা।

আশা ছাড়েননি বাবা। চলে গেছেন হাসপাতালের বাইরে। ফিডার হাতে নিয়ে মেয়ের দুধের জন্য গেছেন অন্য মায়েদের কাছে। রাজধানীর মিরপুর, টিকাটুলি ও খিলগাঁও থেকে দুধ সংগ্রহ করে কিছুদিন খাইয়েছেন মেয়েকে। কিন্তু স্থায়ীভাবে কোনো বন্দোবস্ত করতে পারেননি।

ছোট্ট অপ্সরীর দুধ জোগাড় করতে গিয়ে বাবা মানুষের অনেক রকম চেহারা দেখেছেন। সেসব অভিজ্ঞতার কথা বললেন তিনি। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললেন, ‘রংপুর থেকে আসা এক মা কয়েক দিন আমার মেয়েকে দুধ দিয়েছেন। তিনি চলে যাওয়ার পরই মেয়ের জন্য আর দুধ পাচ্ছেন না।’
হাসপাতালের দুই শিশু মাঝে অসুস্থ ছিল। মায়ের দুধ পানে বারণ ছিল। সেই সময়টায় তাদের মায়েরা অপ্সরীকে দুধ খাওয়ান। তিন দিন পেট ভরে খেতে পেয়েছিল অপ্সরী। কিন্তু নিজেদের শিশুরা সুস্থ হওয়ার পরে অপ্সরীর ভাগের দুধ বন্ধ। কিন্তু দুই ঘণ্টা পরপর অপ্সরীর খাবার প্রয়োজন।
লুপাসে আক্রান্ত অপ্সরীর মাকে আরেকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নবজাতকদের ইউনিটে চাইলেও এখন মেয়েকে দেখতে যেতে পারেন না তিনি। এখানেও সেখানকার মায়েদের আপত্তি। তাঁদের ভয় অসুস্থতার কারণে তাঁদের বা সন্তানদের ক্ষতি হবে।
এ গল্প শুনে নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ খুরশীদ তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন মায়ের বুকে যে পরিমাণ দুধ থাকে, তা থেকে তিনি তিনজন বাচ্চাকে খাওয়াতে পারেন। বুকের দুধ কমে যাবে বলে মায়েদের যে ধারণা, তা ভুল। তাই চাইলেই যেকোনো মা এই শিশুটিকে দুধ খাওয়াতে পারেন। এ ক্ষেত্রে অন্য মায়েদের এগিয়ে আসা উচিত।’
লুপাস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের কোষাধ্যক্ষ ফয়জুননেছা প্রথম আলোকে বলেন, লুপাস ছোঁয়াচে কোনো রোগ নয়। মানুষ এ রোগটি সম্পর্কে জানেন না বলেই ভয় পান।