দুবলহাটি জমিদারবাড়িটির বেঁচে থাকার আকুতি

নওগাঁর দুবলহাটি জমিদারবাড়ির একাংশ l ছবি: প্রথম আলো
নওগাঁর দুবলহাটি জমিদারবাড়ির একাংশ l ছবি: প্রথম আলো

নওগাঁ শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে পুরোনো জীর্ণ একটি বাড়ি। ভাঙা ফটক পেরিয়ে এক জায়গায় কিছু হাঁড়ি-পাতিল ও আসবাবপত্র দেখে গেল। ভেতর থেকে আসা রেডিওর গানের শব্দে স্পষ্ট হলো এখানে কেউ থাকেন। কথা বলে জানা গেল, বাড়ির বাসিন্দা ভূমিহীন। তাই পরিত্যক্ত এই দুবলহাটি জমিদারবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
জমিদারবাড়ির সামনে বিশাল পুকুর। শানবাঁধানো ভাঙা ঘাট উঠে এসেছে নাট মন্দিরে। মন্দিরের ভেঙে যাওয়া স্তম্ভ দেখে বোঝা যায় এখানে একসময় বেশ জৌলুশ ছিল। পুরো বাড়ি সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা। পুরো আঙিনায় একাধিক দালান। ছোট ছোট অসংখ্য ঘর। তার মধ্যে ছাগল বাঁধা আছে। কোনো কোনো ঘরে লাকড়ি (শুকনো ডালপালা) রাখা।
কিছু ভবনের দেয়াল ধসে গেছে। আছে শুধু কাঠামোটা। অনেক জায়গায় আবার শুধু দোতলা ধসে গেছে। আগাছায় ভরা ঘর। মৌমাছিও চাক বেঁধেছে। বাড়ির ভেতরের কাঠামো দেখে এখন আর বোঝার উপায় নেই আগে কোনটি কী ছিল।
ভবনের ভাঙা দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। খুলে নেওয়া হয়েছে ইট। দেয়ালের এখানে-সেখানে ফাঁকফোকড়। দরজা-জানালা নেই একটি ঘরেও।
কিন্তু এ বাড়িতে কারা থাকতেন? এর উত্তর পেতে নওগাঁ শহরের উকিলপাড়ার এক বাড়ির ঠিকানা পাওয়া গেল। বাড়ির কর্তা ষাটোর্ধ্ব একজন বৃদ্ধ। তিনি বললেন, ‘আমি রবীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী।’ তিনি জমিদারির শেষ উত্তরসূরি। বিয়ে করেননি। বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ান। বাংলাদেশে এলে এই বাড়িতে থাকেন। স্বজনেরা বিভিন্ন দেশে থাকেন।
রবীন্দ্রনাথ বলেন, কয়েক শ বছর আগে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে জগৎরাম নামে একজন গুড় ব্যবসায়ী ব্যবসা করতে আসতেন। তিনি দুবলহাটির কয়রা নদীতে তাঁর বজরা ফেলে বিশ্রাম নিতেন। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন দশভুজা রাজেশ্বরী দেবীকে। দেবী তাঁকে বলেন, এখানে তাঁর একটি মূর্তি আছে। তাঁকে তুলে প্রতিষ্ঠা করলে জগৎরামের উন্নতি হবে। এরপর জগৎরাম দুর্গার অষ্ট ধাতুর তৈরি একটি মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। জঙ্গল পরিষ্কার করে জমিদারি পত্তন করেন।
‘বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস’ নামক বইয়ে দেখা যায়, দুবলহাটি জমিদার বংশ তাহিরপুর, পুঠিয়া ও সাঁতৈল জমিদার বংশের থেকেও পুরোনো। ঐতিহাসিক কালিনাথের মতে, পাল আমলে (৭৫০-১১৫০) এ জমিদারির সূচনা ঘটে। এই বংশের জমিদারি নিষ্কর ছিল। মুঘল আমলে ২২ কাহন (১ কাহন=১২৮টি) কই মাছ রাজস্ব ধার্য করা হয়। কারণ এটি ছিল বিল এলাকা। জগৎরামের পরের ৪৪ পুরুষের ইতিহাস খুব একটা বেশি পাওয়া যায় না। শেষ জমিদার হরনাথ রায় পর্যন্ত ৫৩ জন জমিদারি করেন।
উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০১২ সালের আগে বাড়িটি উত্তরসূরিদের দায়িত্বে ছিল। তারপর সরকার বাড়িটিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে নিতে চায়। এ নিয়ে বাড়িটির উত্তরসূরিদের সঙ্গে মামলা হয়। মামলাটি এখনো চলছে।
রবীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী বলেন, বর্তমানে অযত্ন ও অবহেলায় নষ্ট হওয়া রাজবাড়িকে একটি কঙ্কাল মনে হয়। মামলা চললেও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে বাড়িটি একটি দর্শনীয় স্থান হতে পারে। প্রাচীন এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ করা দরকার।