বাংলাদেশে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুরু থেকেই যথাযথ আইন প্রয়োগে ঘাটতি চলছে। এ ঘাটতির সঙ্গে গণতন্ত্রের ঘাটতি সম্পর্ক প্রত্যক্ষ। ‘সাধারণ ছুটি’ বা সারা দেশকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণার মতো বিষয়গুলো আইন সমর্থন করে না। আইন অনুযায়ী ‘দুর্গত এলাকা’ ঘোষণার সুযোগ আছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজির এ–সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপনটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তিনি উল্লেখ করেছেন, সংক্রামক আইনের ১১(১) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তিনি সারা দেশকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’ ঘোষণা করেছেন। অথচ সেখানে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ শব্দটিই নেই। আছে ‘সংক্রমিত এলাকার’ কথা।
‘সাধারণ ছুটি’র সরকারি প্রজ্ঞাপনটিও আইনসম্মত নয়। এটা ভবিষ্যতে নানা আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। রুলস অব বিজনেস শুধুই সরকারি কার্যক্রমের মধ্যে সীমিত। এর দোহাই দিয়ে, বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য চলমান প্রলম্বিত ‘ছুটির’ কার্যত কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
দুটি আইন
বর্তমান করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুটি আইন আছে। ২০১২ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন এবং সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮। অথচ শুরু থেকেই করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই দুটি আইন কার্যত উপেক্ষিত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনটির প্রয়োগ সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। আবার লকডাউন বা নির্দিষ্ট এলাকাকে অবরুদ্ধ ঘোষণা করার সুনির্দিষ্ট বিধান সংক্রামক ব্যাধি আইনে আছে। অথচ সেই আইন উপেক্ষা করে ‘ছুটি’ দিয়ে মানুষকে শুরুতে কার্যত অবকাশের ধারণা দেওয়া হয়েছে। ছুটিতে ঘরে থাকতে ‘অনুরোধ’ করা হয়েছে। অথচ আইন বলছে, মহামারি এলে সংক্রমিত অঞ্চল অবরুদ্ধ করতে হবে। নাগরিকেরা তা অমান্য করলে ছয় মাসের জেল দিতে হবে। দেশে এ রকম নির্দিষ্ট মহামারি আইন থাকতে ‘সাধারণ ছুটি’ ঘোষণা করা হলো কোন বিবেচনা থেকে? তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকেরা এর সুযোগ নিতে পারেন। তাঁরা যুক্তি দিতে পারবেন, তাঁদের কারখানাগুলোর জন্য সরকারের সাধারণ ছুটি প্রযোজ্য নয়। তাই বর্তমান ‘ছুটির’ মধ্যে লে-অফ বা ছাঁটাইয়ের আইনি অধিকার তাঁদের রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
বিদ্যমান আইন দুটি মেনে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে বর্তমানে নানা ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা ও সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে, তার অনেকটাই দূর করা যেত বলে মনে হয়। কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন ১৮ এপ্রিল টিভিতে বলেছেন, টেস্ট কিটের মজুত (প্রধানমন্ত্রী শনিবার সংসদে বলেছেন, ৭২ হাজার কিট আছে) পর্যাপ্ত। কিন্তু গাড়ির অভাবে টেস্ট সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না। এ কথা শুনে স্থানীয় সরকারের সাবেক সচিব আবু আলম বললেন, শুধু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় চাইলেই ৩ হাজার গাড়ি কাল সকালেই হাজির করতে পারে। আবার একই দিন আরেক টিভিতে চট্টগ্রামের স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতা ড. মিনহাজ স্পষ্ট বললেন, চট্টগ্রামের ১২টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কেউ কোভিড-১৯ রোগীকে সেবা দিতে চায় না। এ রকম ঢিলেঢালা অবস্থা কমবেশি দেশের সর্বত্র থাকাটাই স্বাভাবিক। অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের ২৫ ও ২৬ ধারা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপন জারি করলেই মানা বা না মানার প্রশ্ন মিটে যাবে।
ওই দুটি ধারা বলছে, সরকার দুর্গত এলাকা ব্যবস্থাপনায় যেকোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি হাসপাতালের সব ধরনের চিকিৎসা–সুবিধা, যে কারও সম্পদ, যানবাহন, সেবা বা অন্যান্য সুবিধা হুকুম দখল বা রিকুইজিশন করতে পারবে। সংশ্লিষ্টরা তা মানতে বাধ্য থাকবেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আওতায় ‘ছুটির’ মধ্যে শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই, লে-অফ ইত্যাদি অকার্যকর করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে ত্রাণ বিতরণ ও খাদ্যসহায়তার বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছেন। সব সহায়তা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের ২৭ ধারার অধীনে হওয়া উচিত। এতে প্রত্যেক অভাবী মানুষ যেমন, তেমনি ‘দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি সাড়া প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী’ হিসেবে আমাদের ফ্রন্টলাইন যোদ্ধারা আর্থিক প্রণোদনা পাওয়ার দাবিদার। সেখানে নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। কেউ ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ বা ‘বিপদাপন্ন’ হলে ‘উপযুক্ত পুনর্বাসনের’ কথা বলা আছে। একটি বিধি দ্বারা তা নির্দিষ্ট করতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে এই বিধি প্রণয়ন করা হবে অন্যতম কার্যকরী প্রণোদনা।
ডা. মঈন উদ্দিনের অবহেলাজনিত (প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ বি এম আবদুল্লাহ টিভিতে বলেছেন, তিনি সুচিকিৎসা পাননি) মৃত্যু, কুয়েত–বাংলাদেশ মৈত্রীর দুই চিকিৎসকের অপসারণ, ভুয়া এন-৯৫ মাস্কের সরবরাহকারীদের পরিবর্তে প্রতিবাদীদের শাস্তি, এন-৯৫ মাস্ক ও পিপিই না পেয়ে স্বাস্থ্যসচিবের সমালোচনাকারীদের শোকজের মতো ঘটনাবলি চিকিৎসক সমাজকে হতোদ্যম করেই চলেছে। এ ক্ষেত্রেও দুর্যোগ আইনের ২৯ ধারা প্রয়োগ করা যায়। তাহলে তদন্ত ছাড়াই প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক কায়দায় ওএসডি বানানোর মতো সিদ্ধান্ত এড়ানো সম্ভব হবে।
ওই ধারা বলছে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি জাতীয় বা স্থানীয় কমিটির কাছে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা’ সংশ্লিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ করবেন। কমিটি ৩০ দিনের মধ্যে ‘তদন্তপূর্বক অভিযোগের নিষ্পত্তি’ করবে। এই আইনে প্রতিটি প্রশাসনিক একাংশে কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত। এখানেও আইনের ব্যত্যয় চলছে। মার্চের শেষ সপ্তাহে প্রশাসনের সব স্তরে করোনা প্রতিরোধ কমিটি হলো। অথচ তা কোন আইনে হয়েছে, তার উল্লেখ নেই।
সব হচ্ছে আইনের বাইরে
এ–সংক্রান্ত সব পরিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, কোথাও ২০১২ সালের আইনটির বরাত নেই। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় দুর্যোগ (এই আইনে দুর্যোগের মধ্যে মহামারি অন্তর্ভুক্ত) ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল থাকার কথা। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ২৪ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৫০০ সদস্যের কমিটির ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর তিন দিন আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ‘জেলা, পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোকে করোনা মোকাবিলায় দুর্যোগবিষয়ক’ ২০১৯ সালের স্থায়ী নির্দেশাবলি অনুসরণের নির্দেশনা দেন।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালের সংক্রামক আইনটির কোনো উল্লেখ না করেই গত মাসের শেষে করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ডিসি, ইউএনও, ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে কতগুলো কমিটি করেছে। সেই কমিটিগুলোর প্রজ্ঞাপনে কোন আইনের অধীনে করা হয়েছে, তার উল্লেখ নেই।
তবে আইন অনুযায়ী স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার সঙ্গে জনগণের আইন মানার একটি সরাসরি সম্পর্ক আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষেরা হয়তো দেখেছেন, আইন অমান্য করে সহজেই পার পাওয়া যায়। জনগণ তখনই আইন মানতে চায় না, যখন তারা দেখে যে সরকারিভাবেই যথাযথভাবে আইন মেনে চলা হয় না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় কর্মকর্তাদের বদলি সংক্রামক আইনের শর্ত পুরো করবে না। আইনের ২৪ ধারা বলেছে, সংক্রামক জীবাণুর বিস্তারে সহায়তা করা একটি অপরাধ। পুলিশ সুপার বা ওসি সহায়তা দেননি। যাঁরা দিয়েছেন আইন অনুযায়ী তাঁদেরকে ছয় মাসের জেল, অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে।
আইন দুটি অনুসরণের বিকল্প নেই
১৮৯৭ সালের মহামারি আইনেও প্রজ্ঞাপন দিয়ে দুর্গত এলাকা ঘোষণার বিধান ছিল। সেটাই ২০১২ সালের দুর্যোগ আইনে আনা হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন একই বিধানের অধীনে লকডাউন কার্যকর করেন। নিয়ম হলো উদ্ভূত পরিস্থিতি অনুযায়ী একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা। ব্রিটেন ২১ মার্চ স্বাস্থ্য সুরক্ষা (বিজনেস ক্লোজার) প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে কী খোলা থাকবে, কী থাকবে না। এমনকি পাবলিক টয়লেট খোলা থাকবে, তা–ও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। দুদিন পরে তা সংসদেও পেশ করেছে। ২৮ দিন অন্তর তারা বিধান বদলাতে পারে। আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে অনধিক দুই মাস অন্তর পরিবর্তন আনার বিধান আছে।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের অবশ্যই ২০১২ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন এবং ২০১৮ সালের সংক্রামক ব্যাধি আইনের আওতায় সব কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। সে ক্ষেত্রে এই আইন দুটির আওতায় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারির উদ্যোগ নিতে হবে। এখন যেভাবে চলছে, তা আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সমন্বয়হীনতা ও বিশৃঙ্খলাও ঘটছে আইন অনুযায়ী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদ্যোগ না নেওয়ায়।