
দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম রেখে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠন করা যাবে না। রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটের প্রলোভনে সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপসের যে ঝোঁক দেখা যাচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে আস্থার ও নিরাপত্তাবোধের অভাব কীভাবে দূর করা যায়, তা দেখতে হবে।
‘ধর্মীয় সম্প্রীতি ও বর্তমান বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা গতকাল শনিবার এসব অভিমত দেন। প্রথম আলোর উদ্যোগে গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়ে এ গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয়। গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, সাম্প্রতিক ধর্মীয় সংঘাত প্রতিরোধে প্রশাসনিক শক্তির দুর্বলতা রয়েছে। যেখানে ৩০০ লোক মিছিল করে মন্দির ভেঙেছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট থানায় পুলিশ হয়তো মাত্র আটজন। অনেক জায়গায় প্রশাসনের ঔদাসীন্য আছে, কিছু ক্ষেত্রে উসকানিও আছে। তিনি বলেন, সব ধর্মে উদারতা ও মানবীয় সম্প্রীতির বাণী আছে। সংঘাতের কারণ ধর্ম নয়, কিছু মানুষের দুর্বৃত্তপনা। কিন্তু এ দুর্বৃত্তপনায় দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির ভিত নড়ে গেছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের লক্ষ্য সংখ্যালঘু বিতাড়ন। এতে মানুষ অতটা আক্রান্ত হয়নি, কিন্তু বিগ্রহ ভাঙা ও ভয় পাইয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বেশি। তারা চেয়েছে, সংখ্যালঘুরা দেশ ছেড়ে চলে যাক, সংখ্যালঘুদের ভোট কমে যাক। সাম্প্রদায়িক সংঘাত রোধে নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ ঘটানো ও নাগরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো সংগঠন দরকার।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তাঁর আচরণ নিশ্চয়ই আপনারা খবরের কাগজে দেখেছেন, ১৩ দফা দেখেছেন, সরকার-বিরোধী দল সবাই তাঁকে হুজুর বলছে। একাত্তরে, আপনারা জানেন, তিনি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী ছিলেন। হেফাজতের নেতাদের বেশির ভাগ জামায়াতে ইসলামী ও জঙ্গি-মৌলবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’ তিনি আরও বলেন, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব নয়।
রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করেন সামাজিক আন্দোলনের সহসভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের অধিকারহীনতা দূর করতে সংখ্যালঘু কমিশন গঠন জরুরি। প্রতি জেলায় এই কমিশনের দপ্তর ও কার্যক্রম থাকতে হবে। এ ছাড়া সংখ্যালঘুদের বিষয়ে আলাদা মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রী থাকতে পারে। সংসদে সাম্প্রদায়িক প্রচারণা গ্রহণযোগ্য নয়, এটা বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করতে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামকে ব্যবহারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলছে, তা বন্ধ করা দরকার। হেফাজতের নেতারা নারীর বিরুদ্ধে কথা বলছেন, নারীরা কোন ধরনের পোশাক পরবেন তা নিয়ে কথা বলছেন। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ স্লোগান রাষ্ট্রের সব কাজে, সব নীতিতে থাকতে হবে।
জাতিসংঘ সিডও কমিটির সাবেক চেয়ারপারসন ও নারীনেত্রী সালমা খান বলেন, ধর্মকে ব্যক্তিগত জীবনে ধারণ করতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একেবারেই অগণতান্ত্রিক অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রীড়নক হয়ে আমরা ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করছি।
ধর্মীয় সহনশীলতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের মহাসচিব পি কে বড়ুয়া বলেন, ধর্মগুরু, সাংবাদিক, রাজনীতিক, নাগরিক সমাজ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সব ধর্মীয় নেতাদের একসঙ্গে বসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, চৈতন্য দিয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে লাখো-কোটি মানুষকে জাগ্রত হতে হবে।
অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী বলেন, শিক্ষা কারিকুলামে অন্য ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে মানুষকে মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা যায়। সব দলের প্রতি দাবি থাকবে, তারা যেন নির্বাচনী ইশতেহারে রাখে যে ক্ষমতায় গেলে সংবিধান পরিবর্তন করে সংবিধানকে সাম্প্রদায়িক চরিত্র থেকে বের করে আনবে।
অধ্যাপক কাজী নূরুল ইসলাম বলেন, ‘ধর্মীয় সহিংসতার অন্যতম কারণ হচ্ছে অজ্ঞতা। আমার হিসাবমতে, ৯০ শতাংশ মানুষ নিজ ধর্ম সম্পর্কে জানে না, ৯৯ শতাংশ মানুষ অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানে না। অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানলেও দেখা যাবে সেটা ভ্রান্ত ধারণা বা ভুল জানা। তিনি বলেন, রাজনীতির সঙ্গে যখন ধর্ম এসেছে, তখন রাজনীতি ও ধর্ম দুটোরই বারোটা বেজেছে। আমরা চাই রাজনীতি থেকে ধর্ম বিচ্ছিন্ন থাকুক।’
নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ বেঞ্জামিন কস্তা বলেন, ধর্মীয় সহিংসতা যারা করে, তারা ধার্মিক নয়। দেশে যেভাবে সহিংসতার সংস্কৃতি চলছে, ঘুষ-দুর্নীতি—এগুলোও ধর্মের নামে অধর্ম। আনুষ্ঠানিক ধর্ম পালন করলেই কেউ ধার্মিক হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাবেরী গায়েন বলেন, সংসদে শুধু অশ্লীল কথাবার্তা নয়, ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও কথা বলা হচ্ছে। কারও বংশলতিকায় যদি অমুসলিম বা সংখ্যালঘু কাউকে পাওয়া যায়, তবে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করা যায়।
ঢাকার মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার অধ্যক্ষ এ কে এম ইয়াকুব হুসাইন বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে ধর্মীয় বাণী প্রচারের ব্যবস্থা করা দরকার। আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য গ্রামগঞ্জে কমিটি করা যেতে পারে, বেশি করে আন্তধর্মীয় আলোচনা দরকার।
ধর্মীয় সহিংসতার শিকার রামুর সীমা বিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ‘ধর্মের নামে সহিংসতা হয় এ বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত নই। কোনো ধর্ম সহিংসতা শেখায় না। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর রামুতে হামলার পর একটি মুসলিম পরিবার ঝুঁকি নিয়েই আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল। রামুতে ১১টি বৌদ্ধবিহারে হামলা হয়েছিল, আরও বিহার ছিল। সেগুলো রক্ষা করেছে আমাদের মুসলিম প্রতিবেশীরা।’ তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, মৌলিক নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে।
ধর্মীয় সহিংসতার আরেক শিকার নোয়াখালীর রাজগঞ্জের স্কুলশিক্ষক বিমলকান্তি আচার্য বলেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর বেলা আড়াইটা থেকে রাজগঞ্জে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নিপীড়ন আরম্ভ হয়। কোথাও আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যাঁর কাছে যাই, তিনিই বলেন, তোমাদের আশ্রয় দিলে মৃত্যু অনিবার্য। আমাদের এলাকায় এখন সার্বক্ষণিক পুলিশ প্রহরা থাকে। কিন্তু প্রায়ই ধমক-ধামক শুনি, পুলিশ কত দিন থাকবে?