
ঢাকায় গত রোববার হেফাজতে ইসলাম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১০ জনের রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচয় পাওয়া গেছে। এঁদের তিনজন জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মী। তিনজন হেফাজতে ইসলামের সমর্থক। নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। রোববার সকাল থেকে শেষ রাত পর্যন্ত সংঘর্ষ ও অভিযানে পুলিশের সদস্যসহ ২৩ জন নিহত হন।
রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক; মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র; জুতা কারখানার কর্মী, দিনমজুর ও পরিবহনশ্রমিক রয়েছেন। নিহত ১০ জনের লাশই সোমবার নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।
নিহত দুই ছাত্রের পরিবার অভিযোগ করেছে, মাদ্রাসার শিক্ষক ও স্থানীয় এক হুজুর পরিবারকে না জানিয়েই দুই ছাত্রকে ঢাকায় নিয়ে যান।
মাদ্রাসাশিক্ষক শিহাব ছিলেন জামায়াতের বহিষ্কৃত নেতা: নিহত মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন নিজামীর (৫২) বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সাহেরখালী ইউনিয়নের পূর্ব ডোমখালী গ্রামে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সীতাকুণ্ড উপজেলার বগাচতর গণিউল উলুম ফাজিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক ছিলেন।
ওই মাদ্রাসার নুরানি বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ মহিবুল্লাহ জানান, হেফাজতের অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিনি ও শিহাব গত শনিবার ঢাকায় যান। রোববার সন্ধ্যায় মতিঝিল এলাকায় হেফাজতের কর্মীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে শিহাব গুরুতর আহত হন। দি বারাকা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। শিহাব উদ্দিন নিজামী ১০ বছর আগে উপজেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ছিলেন বলে জানিয়েছেন জামায়াতের বর্তমান কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল কবির।
তবে সাহেরখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা জানান, শিহাব জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত হলেও সম্প্রতি তিনি আবার জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তাঁর দুই ছেলে বর্তমানে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
তবে শিহাবের ছেলে মো. শরীফ ও আবদুস সালাম জানান, তাঁদের বাবা একসময় জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে আর তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হননি। পরিবারের সবাইকে জানিয়ে তাঁদের বাবা হেফাজতের অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে ঢাকায় যান।
ইউনুস মোল্লা ছিলেন জামায়াতের সদস্য: নিহত ইউনুস মোল্লার (৪০) গ্রামের বাড়ি বরিশাল নগরের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের রূপাতলী বটতলা এলাকায়।
২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. সুলতান মাহমুদ জানান, ইউনুস মোল্লা বরিশালে জামায়াতের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ঢাকায় গিয়ে তিনি যাত্রাবাড়ী এলাকায় থাকতেন এবং জামায়াতের রাজনীতি করতেন।
কুষ্টিয়ার ইছাহক আলী গাজীপুরে গিয়ে সামছুল আলম: নিহত ইছাহক আলীর (৪৫) গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রিয়ায়েতপুর ইউনিয়নের তেলিগাংদিয়া গ্রামে। তাঁর আত্মীয় জয়নাল আবেদীন জানান, ইছাহক দৌলতপুরে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও জামায়াতের কর্মী ছিলেন। দৌলতপুরের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া কয়েক লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর ২০০৩ সালের দিকে তিনি সপরিবারে গাজীপুরে চলে যান। সেখানে জুতা তৈরির একটি কারখানায় কাজ করতেন। ১০ বছর পর ফিরলেন লাশ হয়ে।
একই তথ্য জানান ইছাহকের জানাজায় অংশ নেওয়া দৌলতপুর উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের জামায়াতের নেতা ও ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের দৌলতপুর শাখার কর্মকর্তা আবুল হাশেম।
জানা গেছে, ইছাহক পরিবার নিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার হরিণহাটি এলাকার একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। কাজ করতেন এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড কারখানায়। এখানে তিনি সামছুল আলম (৪৫) নামে পরিচয় দিতেন।
কালিয়াকৈর উপজেলা হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মুফতি এমদাদুল হক জানান, সামছুল আলম হেফাজতের সদস্য ছিলেন। কালিয়াকৈরে জানাজা শেষে তাঁর লাশ কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।
গণিতের ছাত্র ইব্রাহিম: নিহত ইব্রাহিম খলিল (২৫) ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের গণিত বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণীর ছাত্র। বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামে। তাঁর বাবা আবদুর রশিদ খান চরমোনাই পীরের অনুসারী ও স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইব্রাহিমের সহপাঠীরা জানান, ইব্রাহিম খলিল ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তবে বরিশাল নগরের কাউনিয়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ইব্রাহিম তাবলিগ জামাত করতেন।
মো. ইউনুস ছিলেন মসজিদের ইমাম: কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মোহাম্মদপুর পূর্ব ইউনিয়নের থৈরখোলা গ্রামের পূর্বপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন হেফাজতের সমর্থক মাওলানা মো. ইউনুস (৩০)। গ্রামের বাড়ি গাজীপুর জেলা সদরে। তাঁর স্ত্রী ও এক মেয়ে রয়েছে।
দাউদকান্দি উপজেলা হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আবু ইউসুফ মুন্সী নিশ্চিত করেছেন, ইউনুস তাঁদের সমর্থক ছিলেন।
বুয়েটের ছাত্র রেহান গিয়েছিলেন সংঘর্ষ দেখতে: বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র রেহান আহসান নওগাঁ শহরের মধ্যপাড়া মহল্লার ব্যবসায়ী এ কে এম মামুন আহসানের ছেলে। রেহানের মা ইফ্ফাত আরা বলেন, ‘আমার ছেলে ধর্মপ্রাণ ছিল, অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করত। মৃত্যুর পর রেহানের বন্ধুরা আমাদের জানায়, তারা পুলিশ ও হেফাজতের সমর্থকদের গন্ডগোল দেখতে গিয়েছিল।’
রেহানের চাচা জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাসুম জানান, ‘রেহান কোনো রাজনীতি করত না। আমরা পারিবারিকভাবে সবাই ধার্মিক ও ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী। আমাদের পরিবারে আওয়ামী লীগ, বিএনপি সব দলেরই লোক আছে।’ তিনি বলেন, ‘কেউ যেন লাশ নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ না পায়, তাই সোমবার রাতে লাশ পৌঁছামাত্র দাফন সম্পন্ন করেছি।’
পরিবারকে না জানিয়ে ঢাকায়: ‘গত শনিবার রাতে জোবায়ের একবার আমাকে ফোন করে বলেছিল, মাদ্রাসা থেকে ঢাকায় যেতে হবে। আর কিছু বলেনি। তারপর আর তার সাথে কথা হয়নি। আমার ছেলেরে হুজুরেরা নিয়া মাইরা আনছে।’
বলছিলেন ঢাকায় সংঘর্ষে নিহত নরসিংদী শহরের সাটিরপাড়া এলাকার মাহমুদুল হাসান ওরফে জোবায়েরের (২০) বাবা আবদুল বাছেদ।
পরিবারের লোকজন জানান, জোবায়ের সদর উপজেলার মাধবদী দরগাবাড়ী হাফিফিয়া আজিজিয়া মাদ্রাসার আলিম শ্রেণীতে পড়ত। গত শুক্রবার সকালে বাড়ি এসে বিকেলে মাদ্রাসায় চলে যায়। গত সোমবার ভোরে মাদ্রাসার শিক্ষক জিলানী ও আবদুল কাদির অ্যাম্বুলেন্সে করে জোবায়েরের লাশ বাড়িতে আনেন। তাঁরাই পরিবারকে জানান, জোবায়ের ঢাকায় পুলিশের গুলিতে মারা গেছে।
আবদুল বাছেদ অভিযোগ করেন, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাঁর ছেলেকে ঢাকায় হেফাজতের অবরোধ কর্মসূচিতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর কোনো অনুমতি নেয়নি।
সংঘর্ষে নিহত মোক্তার হোসেন (১৪) নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার দক্ষিণ বাখননগর এলাকার মোহর আলীর ছেলে। এ বছর উত্তর বাখননগর উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে আর বিদ্যালয়ে যায়নি।
মোক্তারের চাচাতো ভাই ও উত্তর বাখননগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রফিক মিয়া বলেন, মোক্তার পরিবারের কাউকে কিছু না বলেই স্থানীয় এক হুজুরের সঙ্গে রোববার ঢাকায় হেফাজতের অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। তবে তাঁরা ওই হুজুরকে চিহ্নিত করতে পারেননি।
দিনমজুর দীন ইসলাম: তাঁর বাড়ি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার নতুন ভাসানচর গ্রামে। বাবার নাম মোহাম্মদ মীর। দীন ইসলামের শিশু এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে।
দীন ইসলামের ভাই হাসেম মীর জানান, দীন ইসলাম এক বছর আগে দুবাই থেকে ফিরে গৃহস্থির (দিনমজুর) কাজ করতেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবে হেফাজতের ভক্ত ছিলেন।
অভিমান ভাঙল লাশ হয়ে: হানিফ পরিবহনের বাসচালকের সহযোগী (হেলপার) আবু বক্কর সিদ্দিকের (৩০) গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নের চাউলিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা মো. আমিনুল ইসলাম ভোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য।
আমিনুল জানান, তাঁর চার ছেলের মধ্যে আবু বক্কর সিদ্দিক ছিল দ্বিতীয়। সে কোনো দল করত না। হানিফ পরিবহনে হেলপার পদে চাকরি করত। রোববার দুপুরে পুলিশ তাঁদের বাস রিক্যুইজিশন করেছিল। বেলা তিনটার দিকে পল্টনে হেফাজতের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় আত্মরক্ষার জন্য দৌড়ে পালাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় সে। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঢাকা থেকে তাঁর মরদেহ নিয়ে আসে।
আমিনুল বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘১০ বছর আগে সিদ্দিক আমার ওপরে অভিমান করে ঢাকায় গিয়েছিল। বড় হয়ে গাড়ির মালিক হতে চেয়েছিল। অনেক দিন কোনো খবর ছিল না। বাড়ি আসত না। এখন আসল লাশ হয়ে।’
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন আসাদুল্লাহ্ সরকার, দিনাজপুর; সাইফুর রহমান, বরিশাল; তৌহিদী হাসান, কুষ্টিয়া; তানভীর হাসান, মুন্সিগঞ্জ; মাসুদ রানা, গাজীপুর; মনিরুজ্জামান, নরসিংদী; শফিকুল ইসলাম, নওগাঁ; শারফুদ্দীন কাশ্মীর, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) ও আবদুর রহমান ঢালী, দাউদকান্দি (কুমিল্লা)