
আজ ভোরে ফুল সংগ্রহ করে নদীতে ভাসানোর পর প্রতিটি বাড়ি ফুল দিয়ে সাজানো হবে। পরের দিন অতিথি আপ্যায়ন ও খানাপিনা। তৃতীয় দিনে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পূজা অর্চনা। রাঙামাটি শহরের নিরুতি বালা চাকমা ও বিনয় লক্ষ্মী চাকমা বললেন তাঁদের বিঝু উৎসবের কথা।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়িদের প্রধান সামাজিক উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা আজ থেকে শুরু হচ্ছে। সম্প্রদায়ভেদে এ উৎসব পাঁচ দিন কিংবা এক সপ্তাহ ধরে চলে। ইতিমধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ের বিভিন্ন গ্রামে। চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সম্প্রদায় উৎসবটিকে ভিন্ন নামে ডাকে। চাকমা সম্প্রদায় বিঝু, ত্রিপুরারা বৈসুক, মারমারা সাংগ্রাই, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু, অহমিয়ারা বিহু ও চাক, ম্রো ও খুমিরা চাংক্রান নামে উৎসবটি পালন করে। সমতলের লোকজনের কাছে এই উৎসব বৈসাবি নামে পরিচিত। তবে পাহাড়ের মানুষ বৈসাবি শব্দটি নিয়ে বিতর্ক তুলেছেন। তাঁরা বলছেন, বৈসাবি শব্দটি দিয়ে পাহাড়ের শুধু তিনটি সম্প্রদায়ের উৎসবকে বোঝায়। এরা হলো চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা। ফলে বাকি অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনের উৎসবের কথা বাদ পড়ে যাচ্ছে।
চাকমাদের উৎসব শুরু হওয়ার এক দিন পর মারমাদের উৎসব শুরু হবে। চলবে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত। উৎসবের প্রথম দিন ফুল ভাসানো, দ্বিতীয় দিনে অতিথি আপ্যায়ন, তৃতীয় দিনে পূজা অর্চনা ও চতুর্থ দিনে পানি উৎসব। উৎসবের শুরুর দিনে সকালে ১১টি পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠী জেলা শহরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করবে। গতকাল মঙ্গলবার সাংগ্রাই উদ্যাপন পরিষদের এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মারমাদের মতো ম্রো, খিয়াং, চাক, খুমিসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীও একই সময়ে উৎসব উদ্যাপন করবে। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সাংগ্রাই উদ্যাপন পরিষদের সহসভাপতি মং মং প্রু মারমা।
ত্রিপুরাদের উৎসব ১৩ থেকে ১৫ এপ্রিল। উৎসবের প্রথম দিন দল বেঁধে পিঠা তৈরির প্রস্তুতি ও গরাইয়া নৃত্য, দ্বিতীয় দিনে অতিথি আপ্যায়ন ও তৃতীয় দিনে বৃদ্ধদের গোসল করানো ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে মোরগ-মুরগিকে খাবার দেওয়া ও পূজা অর্চনা করা হয়।
অহমিয়া সম্প্রদায়ের পংকজ আসাম রাঙামাটি শহরের আসামবস্তি এলাকায় থাকেন। তিনি বলেন, অহমিয়াদের প্রথম দিনে ফুল দিয়ে বাড়িঘর সাজানো হয়। দ্বিতীয় দিন অতিথি আপ্যায়ন ও তৃতীয় দিন বৃদ্ধদের প্রণাম করা বা আশীর্বাদ নেওয়া হয়। তাঁরা (অহমিয়ারা) সংখ্যায় খুব কম। সামগ্রিকভাবে বিহু উপলক্ষে অন্য সম্প্রদায়ের মতো তেমন কিছু আয়োজন করতে পারেন না। তবে সবাই মিলে ১০ বছর পর এবার উৎসব আয়োজন করার চেষ্টা হচ্ছে। ঘরোয়া কিছু নিয়ম, নীতি ও আচরণের মাধ্যমে উৎসব পালন করবেন তাঁরা।
চাক জনগোষ্ঠী বাড়িঘর সাজানো, অতিথি আপ্যায়ন ও দল বেঁধে এক গ্রামের লোক অন্য গ্রামে গিয়ে বুদ্ধমূর্তি চন্দনের পানি দিয়ে গোসল করানোর আনুষ্ঠানিকতা পালন করেন। অন্যদিকে খুমিরা প্রথম দিন ঘরবাড়ি পরিষ্কার, দ্বিতীয় দিন আপ্যায়ন ও তৃতীয় দিন কোনো কাজ না করে বসে থেকে উৎসব পালন করেন।
রাঙামাটি শহরের কলেজ গেট এলাকার সুগত চাকমা বলেন, পাহাড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায় এই উৎসবকে একই সময় পালন করলেও কিছু ভিন্ন ঐতিহ্য রয়েছে। আধুনিকতার প্রভাব ও চর্চা না থাকা কিছু কিছু বিষয় হারিয়ে গেছে বা হারিয়ে যাচ্ছে।
খাগড়াছড়িতে গতকাল নানা আয়োজনে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর এই উৎসবের উদ্বোধন করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে এ উৎসবের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। পরে পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে একটি শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রার পর মারমা সম্প্রদায়ের পানি খেলা ও ত্রিপুরাদের গড়িয়া নৃত্যসহ মনোজ্ঞ ডিসপ্লে হয়।