শহর ঘুরে

পিছিয়ে পড়ছে চট্টগ্রাম!

চট্টগ্রাম নগরের জামালখান মোড়। বর্ণিল এই ফোয়ারা এবং আশপাশের সড়কের আলোকসজ্জা এলাকার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। ছবিটি গতকাল সন্ধ্যায় তোলা l প্রথম আলো
চট্টগ্রাম নগরের জামালখান মোড়। বর্ণিল এই ফোয়ারা এবং আশপাশের সড়কের আলোকসজ্জা এলাকার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। ছবিটি গতকাল সন্ধ্যায় তোলা l প্রথম আলো

চট্টগ্রাম শহরটা ভালোমতো চিনি না। তবে জামালখান এলাকাটি চেনা, প্রথম আলোর অফিস ছিল বলে। এখানেই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান সরকারি খাস্তগীর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির সামনের চৌরাস্তার মোড়। সেই মোড়ের সড়কদ্বীপে ফোয়ারা থেকে পানি উৎসারিত হচ্ছে। সড়কের মাঝে আলোকসজ্জা। রাতের বেলা রঙিন আলোয় সে দৃশ্য মনোরম হয়ে ওঠে। এভাবে পাল্টেছে জামালখানের চেহারা। এর আগে চট্টগ্রাম গিয়ে এই ফোয়ারা দেখিনি। পুরো শহরটাই যদি এমন হতো!

গত ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে জিইসি মোড় পর্যন্ত আসার সময় ধুলো-ধূসরিত পথে যেতে যেতে চোখে পড়ল নতুন অনেক কিছু। প্রতিবার বন্ধুদের গাড়িতে করে চট্টগ্রামে চলাফেরা করলেও এবার শহরটাকে অন্যভাবে দেখার বাসনা থেকে রিকশা আর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ঘুরেছি। বিমানবন্দর থেকে অটোরিকশায় নামলাম জিইসি মোড়ে। কিন্তু চিরচেনা এলাকাটি আমার অচেনাই মনে হলো। ওখানে আকাশটা ঢেকে গেছে। উন্নয়নের ধুলো উড়িয়ে সেখানে তরতর করে উঠে যাচ্ছে উড়ালসড়ক। এর আগে দেওয়ানহাট ওভারব্রিজ পার হওয়ার সময় মাথার ওপর আরেকটি উড়ালসড়ক দেখলাম। স্টেশনরোড থেকে ধনিয়ালাপড়া পর্যন্ত আরও একটি উড়ালসড়ক এর মধ্যে হয়ে গেছে। অবশ্য বহাদ্দারহাটেই প্রথম উড়ালসড়ক হয়েছিল চট্টগ্রামে। এখন লালখান বাজার পর্যন্ত আরেকটি উড়ালসড়ক ডানা মেলছে।

এ রকম কিছুদিন বিরতি দিয়ে কেউ যদি বন্দরনগরে পা রাখেন তবে তাঁর কাছে অচেনা মনে হবে চট্টগ্রাম। দ্রুত এর চেহারাটা পাল্টে যাচ্ছে। কদিন আগে কর্ণফুলীর তলদেশে টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী। কর্ণফুলী-তীরবর্তী এই নগরে আপাতদৃষ্টিতে উন্নয়নের জোয়ার বইছে বলেই মনে হয়। কিন্তু উন্নয়নের এই কোলাহলের ভেতরে কোথাও যেন চাপা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রয়েছে।


এবার চট্টগ্রাম গিয়ে ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, আইনজীবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। সমাজের উঁচু থেকে নিচু স্তরের লোকজনের মধ্যে কিছুটা হতাশাও লক্ষ করেছি।
ব্যবসায়ীদের কণ্ঠেই হতাশাটা বেশি মনে হলো। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার প্রক্রিয়া কতটা এগোল, সেটা নিয়ে কথা বলেছিলাম। তাঁরা ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, উল্টোটা হয়েছে। চট্টগ্রাম বরং পিছিয়েছে। বাণিজ্যিক রাজধানীর কনসেপ্ট হলো, চট্টগ্রাম হবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র। ব্যবসাসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য ব্যবসায়ীদের ঢাকার দিকে তাকাতে হবে না। কিন্তু একে একে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, করপোরেট হাউস এখান থেকে গুটিয়ে ঢাকায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে ঢাকার ওপর নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ একসময় সারা দেশের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত, এখন সেখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

এ পরিস্থিতিতে নতুন বা তরুণ উদ্যোক্তারা কীভাবে এগিয়ে আসবেন? চট্টগ্রামের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং এফবিসিসিআইয়ের সাবেক নেতা বললেন, তাঁর ছেলে স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে লেখাপড়া করছে। তিনি চান, ছেলে ফিরে এসে ব্যবসার হাল ধরবে। ব্যবসার পরিসর বাড়াবে, তার আধুনিক শিক্ষা কাজে লাগিয়ে ব্যবসাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যাবে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তা সম্ভব কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তাঁর প্রশ্ন, ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে হলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। চট্টগ্রামে সেই যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোথায়?

ব্যবসার জগতের বাইরে এসে নগরবাসীর সঙ্গে কথা বললেও হতাশা চোখে পড়ে। যানজট, ধুলো-ময়লা, ভাঙা রাস্তা, পাহাড় কাটা এখন এ শহরের মানুষের নিত্যসঙ্গী। নগরের যেখানেই গিয়েছি মুক্ত ফুটপাত খুব কম দেখেছি। পর্যটন শহর বলা হলেও পর্যটকদের ঘোরার জন্য কোনো বাহন নেই। ট্যাক্সি সার্ভিস নেই। রিকশা আর সিএনজিচালিত অটোরিকশাই সম্বল। মাইক্রোবাস ভাড়া পাওয়া যায় কিন্তু বেশ ব্যয়বহুল। বাস সার্ভিসের অবস্থা ভালো না। এসব ক্ষেত্রে নগরের চিত্র হতাশাজনক।

স্থানীয় পত্রিকাগুলো স্থানীয় মানুষের মনের ভাব বুঝতে পারে। চট্টগ্রামের স্থানীয় একটি পত্রিকা দেখলাম, তার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ক্রোড়পত্রের বিজ্ঞাপন দিয়েছে। ক্রোড়পত্রের বিষয়বস্তু হলো ‘পিছিয়ে পড়ছে চট্টগ্রাম’। আমি কদিন ধরে যে এত মানুষের সঙ্গে কথা বললাম, এই বিষয়ের সঙ্গে তার মিল পেলাম।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দুটি বিপরীত চিত্র পেয়েছি। রাস্তাঘাটে যাঁরা চলেন, যাঁরা রিকশা, অটোরিকশা চালান, তাঁরা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজদের উৎপাত নেই আগের মতো। অবশ্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে মনে হবে ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজদের পদোন্নতি হয়েছে। ওরা এখন পথে পথে মানুষকে বিরক্ত করে না। দল বেঁধে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে চাঁদা নিয়ে আসে। এটাকে বলে নীরব চাঁদাবাজি। একজন বড় ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বললেন, এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। তাঁর কাছে এ ধরনের চাঁদাবাজির ভিডিও ফুটেজ আছে। অথচ সেটা প্রশাসনকে দেখিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবেশও নেই। চট্টগ্রাম শহরে ডিসি হিল ছাড়া কোনো বড় পার্ক নেই। ডিসি হিলের কাছে এনায়েতবাজার ও নন্দনকাননে বন্ধুর বাসায় যেতে যেতে জানলাম, প্রাতভ্র৴মণ ও বৈকালিক ভ্রমণের জন্য প্রতিদিন শত শত মানুষ আসে এখানে। কিন্তু সেই পার্কটি বছরের অধিকাংশ সময় নানা অনুষ্ঠান ও মেলার জন্য দখল হয়ে থাকে।

পাহাড় কেটে কেটে একসময়ের পাহাড়ি চট্টগ্রামে এখন পাহাড়ই চোখে পড়ে না। দখলে দূষণে কর্ণফুলীর কপালেও বুড়িগঙ্গার নিয়তি লেখা আছে মনে হলো। ঘটা করে উড়ালসড়ক বানানো হচ্ছে কিন্তু সেগুলো কাজে আসছে না। উড়ালসড়ক ফাঁকাই থাকছে, নিচে যানবাহনের ভিড়। বর্তমানে ‘টক অব দ্য টাউন’ মনে হয়েছে এই উড়ালসড়ক। যাঁদের সঙ্গেই কথা বলেছি, উড়ালসড়কের বিষয়টি চলে এসেছে। সবাই বলছেন, অপরিকল্পিত এই নির্মাণকাজের কোনো মানে হয় না। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কানে যায় না। শুধু উন্নয়ন করাই যে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাজ! এ নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ ক্ষুব্ধ। এ ধরনের উন্নয়নের দরকার ছিল? এ প্রশ্ন করেছিলাম নগরপিতা (মেয়র) আ জ ম নাছিরকে। তিনি বিব্রত হলেও ‘অপরিকল্পিত উন্নয়ন’ যে হচ্ছে তা স্বীকার করলেন। তাঁর মাথায়ও উন্নয়নের চিন্তা ঘুরছে। বললেনও। সেটি হলো মেট্রোরেল। দূর ভবিষ্যতে নগরবাসী হয়তো উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে মেট্রোরেল চলতে দেখবে। মানুষের ভোগান্তির আরেকটি বিষয় হলো ধুলো আর ময়লা-আবর্জনা। মেয়রকে প্রশ্ন করেছিলাম। এত ধুলা-আবর্জনা। শহরে চলা যায় না। তিনি এটা স্বীকার করে নিয়ে বললেন, শহরে উন্নয়নকাজ চলছে। সেবা সংস্থাগুলো বিভিন্ন উন্নয়নকাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি করছে বলে ধুলা উড়ছে। খুব সকালে বের হন, দেখবেন শহরটা কত সুন্দর! ২ ডিসেম্বর আমি সকাল ছয়টায় বেরুলাম। শহরটি তখন ঘুমিয়ে, সম্ভবত নগরপিতাও। ধুলা মহাশয়েরও তখন ঘুম ভাঙেনি।