২০০৩ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বছরে তিন থেকে চারটি হাতি হত্যা।
২০২০ সালে দেশে ১২টি হাতি হত্যা।
চলতি বছর এরই মধ্যে হাতি মৃত্যুর সংখ্যা ৩৩।
বন দখলকারী একটি চক্র ভাড়াটে খুনিদের নিয়ে হাতি হত্যা করাচ্ছে। শেরপুর, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে একই কায়দায় হাতি হত্যা।
চলতি মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে দেশে সাতটি হাতিকে হত্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি তিন দিনে একটি করে হাতি মারা পড়ছে। ২০০৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশে বছরে হাতি হত্যার সংখ্যা ছিল তিন থেকে চারটি।
দেশে কোনোমতে টিকে থাকা ২৬২টি হাতিকে রক্ষায় সরকার একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছিল। যাতে ২০১৮ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে হাতির সংখ্যা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ২০১৯ সাল থেকে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু দেশে হাতি হত্যা না কমে উল্টো বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে দেশে ১২টি হাতি হত্যা করা হয়। আর চলতি বছর এরই মধ্যে হাতি মৃত্যুর সংখ্যা ৩৩।
আইইউসিএন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাকিবুল আমীন প্রথম আলোকে বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতর দিয়ে হাতির যাওয়ার একটি করিডর তৈরির পাশাপাশি দেশে হাতির বিচরণের অন্য পথগুলো সুরক্ষিত করতে হবে। আমরা রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দাদের সচেতন করে বেশ কটি হাতিকে প্রাণে রক্ষা করতে পেরেছি।
হঠাৎ এভাবে হাতি হত্যা বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা ভিন্ন এক আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন। চলতি মাসে একাধিক হাতির মৃত্যুর এলাকা ঘুরে এসেছেন অন্তত দুজন হাতি বিশেষজ্ঞ। তাঁরা সরেজমিনে দেখে ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন, হাতি হত্যায় দক্ষ একটি পেশাদার দল সাম্প্রতিক সময়ে সক্রিয় হয়ে উঠছে। স্থানীয় বন দখলকারী একটি প্রভাবশালী চক্র ভাড়াটে এসব খুনিকে নিয়ে হাতি হত্যা করাচ্ছে। শেরপুর থেকে শুরু করে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে একই কায়দায় হাতি হত্যা চলছে বলে তাঁদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
এশীয় হাতি রক্ষাবিষয়ক আন্তদেশীয় জোটের বিশেষজ্ঞ ও হাতি গবেষক মোস্তফা ফিরোজ প্রথম আলোকে বলেন, এটা পরিষ্কার যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র পেশাদার খুনি দিয়ে হাতি হত্যা করাচ্ছে। যেভাবে চলছে, তা এই মুহূর্তে থামানো না গেলে ২০২৭ সালের আগেই দেশ থেকে হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। হাতি রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বন বিভাগ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এই মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিসহ সরকারের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে হাতি রক্ষায় দ্রুত উদ্যোগ দরকার।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হাতি হত্যার পেছনে বন দখলকারী একটি চক্রকে তারাও পর্যবেক্ষণ করছে। ওই চক্র সংরক্ষিতসহ দেশের নানা ধরনের বনের ভেতরে দখল বজায় রাখার জন্য হাতি হত্যায় মেতে উঠেছে। কারণ, বনের ভেতরে গাছ কাটার পর সেখানে তারা ফসলের চাষ করছে। আর ওই ফসল পেকে ওঠার পর তা রক্ষায় তারা জমির চারপাশে বিদ্যুতের তার দিয়ে দিচ্ছে। সরকারের পল্লী বিদ্যুৎ থেকে বিদ্যুৎ–সংযোগ নেওয়ার পাশাপাশি জেনারেটরের মাধ্যমে তারা ওই তারে বিদ্যুতায়িত করছে। হাতি চলাচলের মৌসুমে ওই পথে তারা বিদ্যুতের তার দিয়ে আটকে রাখছে। চলাচলের সময়ে সেখানে বাধা পেয়ে আটকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা পড়ছে হাতি।
শেরপুরে মারা যাওয়া দুটি হাতি নিজে পর্যবেক্ষণ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, কয়েক বছর ধরে বনের ভেতরে ওই হত্যাকারী চক্র পরিকল্পিতভাবে হাতি হত্যা করছে। আমরা জানতে পারলাম, শেরপুরের শালবনের বড় অংশ এখন আর বনভূমি নেই। সেখানে গাছ কেটে কৃষিকাজ হচ্ছে। এভাবে হত্যা চলতে থাকলে দেশ থেকে হাতি বিলুপ্ত হতে সময় লাগবে না।’
বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ দিনে দেশে মারা যাওয়া সাতটি হাতির মধ্যে অন্তত চারটি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার প্রমাণ তাঁরা পেয়েছেন। আর একটি হাতিকে সরাসরি গুলি করে মারা হয়েছে। সব কটি হাতি মারা গেছে বনের ভেতরে ও আশপাশের বসতি এলাকায়। গত এক বছরে মারা যাওয়া ৩৩টি হাতির মধ্যে অন্তত ২০টি মারা গেছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি হাতির মৃত্যু হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে।
বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন সংরক্ষক মোল্লা রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, বন বিভাগের একার পক্ষে হাতি রক্ষা করা যাবে না। কারণ বনের ভেতর অবৈধ দখলদারেরা কীভাবে বিদ্যুৎ–সংযোগ নেয়, ফসলের চাষ করে আর অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করে, তা দেখার দায়িত্ব একা আমাদের নয়। সরকারের অন্যান্য সংস্থাগুলোর সহযোগিতা ছাড়া হাতি বাঁচানো যাবে না।
এটা পরিষ্কার যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র পেশাদার খুনি দিয়ে হাতি হত্যা করাচ্ছে। যেভাবে চলছে, তা এই মুহূর্তে থামানো না গেলে ২০২৭ সালের আগেই দেশ থেকে হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।মোস্তফা ফিরোজ
বন বিভাগ ও আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের তথ্যমতে, রোহিঙ্গা শিবিরের কারণে কক্সবাজারের টেকনাফের সংরক্ষিত বনের এক পাশে ৪৪টি হাতি আটকে আছে। শিবিরগুলো নির্মিত হয়েছে এশীয় বন্য হাতির চলাচলের প্রধান পথে। ফলে হাতিগুলো ঘুরপথে মানুষের বসতি এলাকার দিকে যাচ্ছে। খাদ্যসংকটে পড়ে ঢুকে পড়ছে মানুষের ফসলি জমিতে। মানুষ ফসল ও বসতভিটা রক্ষায় হাতি হত্যা করছে।
আইইউসিএন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাকিবুল আমীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতর দিয়ে হাতির যাওয়ার একটি করিডর তৈরির পাশাপাশি দেশে হাতির বিচরণের অন্য পথগুলো সুরক্ষিত করতে হবে। আমরা রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দাদের সচেতন করে বেশ কটি হাতিকে প্রাণে রক্ষা করতে পেরেছি। বনের ভেতরে হাতি মৃত্যুর কারণ দেখার জন্য সরকারের সব কটি সংস্থাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে।’
হাতি হত্যা বন্ধে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বন ও পরিবেশসচিব, প্রধান বন সংরক্ষক ও বন্য প্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের পরিচালকসহ বিবাদীদের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল রুলসহ এ আদেশ দেন।
হাতির নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় বন বিভাগ থেকে হাতি চলাচলের জন্য চিহ্নিত ১২টি করিডর সংরক্ষণে নির্দেশনা চেয়ে রোববার ওই রিটটি করেন বন্য প্রাণী নিয়ে কাজ করা ঢাকার মোহাম্মদপুরের তিন বাসিন্দা—আদনান আজাদ, ফারজানা ইয়াসমিন ও খান ফাতিম হাসান। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী খান খালিদ আদনান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার।