উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বঞ্চিত করলে তিন বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রেখে আজ মন্ত্রিসভায় পাস হয়েছে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ ।
আইনে প্রতিবন্ধকতার ধরন হিসেবে অটিজম, শারীরিক, মানসিক, দৃষ্টি, বাক, বুদ্ধি, শ্রবণ, শ্রবণ-দৃষ্টি, বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি ও অন্যান্য প্রতিবন্ধিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে ২০০১ সালের আইনটি যুগোপযোগী ও বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেছিল। এ ছাড়া, ২০০৬ সালের জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক সনদ অনুসমর্থনের পর ওই সনদের আলোকে নতুন আইন তৈরির বাধ্যবাধকতাও ছিল।
নতুন আইনে বলা হয়েছে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত কাজে নিয়োগ না দিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না। এ ছাড়া, গণপরিবহনে মোট আসনসংখ্যার পাঁচ ভাগ আসন সংরক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ভর্তিসংক্রান্ত বৈষম্যের প্রতিকার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দেওয়া ইত্যাদি ধারা নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আইন কার্যকর হওয়ার পর সরকারি-বেসরকারি ভবন, পার্ক, স্টেশন, বন্দর, টার্মিনাল ও সড়ক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। পাঠ্যপুস্তক, প্রকাশনা বা গণমাধ্যমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে নেতিবাচক শব্দের ব্যবহার করলেও একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে এই আইনে।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন পায়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দেখভালের দায়িত্ব সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। এ মন্ত্রণালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, ‘আইনের খসড়ায় যেসব জায়গায় গ্যাপ ছিল, আইন মন্ত্রণালয় তাতে সংশোধন করেছে। বর্তমানে যে আইনটি পাস হলো, তা একটি ভালো আইন বলেই মনে হচ্ছে।’ ২০০১ সালের বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইনের চেয়ে ভালো হয়েছে বলে সচিব মন্তব্য করেন’।
ক্ষতিপূরণ
আইন অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতি কেউ বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করে জেলা কমিটির কাছে আবেদন করতে পারবেন। জেলা কমিটির আদেশে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে জাতীয় নির্বাহী কমিটির কাছে আপিল করতে পারবেন। পরিশোধযোগ্য কোনো ক্ষতিপূরণ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা না হলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বকেয়া ভূমি রাজস্ব যে পদ্ধতিতে আদায় করা হয়, সেই পদ্ধতিতে আদায় করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে দেওয়া হবে। এ অর্থ আদায়ে সুবিধার জন্য জাতীয় নির্বাহী কমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অনুরোধ করতে পারবে। উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়েরেরও বিধান রাখা হয়েছে আইনে।
অধিকার
আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পূর্ণমাত্রায় বেঁচে থাকা, আইনি স্বীকৃতি এবং বিচারগম্যতা, উত্তরাধিকার পাওয়া, মত প্রকাশ, তথ্য পাওয়া, সমাজে বসবাস, বিয়ে ও পরিবার গঠন, প্রবেশগম্যতা; সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণ, একীভূত বা সমন্বিত শিক্ষায় অংশগ্রহণ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি; শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির ইচ্ছা অনুযায়ী বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণ, স্ব-সহায়ক সংগঠন ও কল্যাণমূলক সংঘ বা সমিতি গঠন ও পরিচালনা, ভোট দেওয়া, নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন অধিকারের কথা বলা আছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধিতা-বিষয়ক একটি কমিশন গঠনের দাবি ছিল। পরে আইনের খসড়া থেকে কমিশন গঠনের বিষয়টি বাদ দেওয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কিছুটা আশাহত হয়েছেন। তাঁদের মতে, ২০০১ সালের আইনেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে জাতীয় সমন্বয় কমিটি, নির্বাহী কমিটি ও জেলা কমিটি ছিল। কিন্তু সেসব কমিটি কাগজে-কলমেই ছিল, বাস্তবে সেসব কমিটির কাছ থেকে কোনো প্রতিবন্ধী মানুষই সুফল পাননি। এবারের নতুন আইনেও জাতীয় সমন্বয় কমিটি, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জেলা কমিটি, উপজেলা কমিটি, শহর কমিটির কথা বলা আছে। তাই একটি কমিশন গঠনের দাবি ছিল।