অদম্য আব্দুল্লাহ

ফুটবলানন্দে জীবনের জয়গান

দুই পা নেই। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতাকে জয় করেও তবু ফুটবলে মজে আছেন আবদুল্লাহ। গত মঙ্গলবার পল্টন ময়দান থেকে তোলা ছবি l জাহিদুল করিম
দুই পা নেই। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতাকে জয় করেও তবু ফুটবলে মজে আছেন আবদুল্লাহ। গত মঙ্গলবার পল্টন ময়দান থেকে তোলা ছবি l জাহিদুল করিম

জীবনের পাতা থেকে সব আনন্দ যেন মুছে গেছে ছেলেটির। এখন তাঁর দিনরাত কাটে বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে। দুমুঠো ভাতের জন্য কতই না ঘাম ঝরান। এই কঠিন দুনিয়ায় একজন সুস্থ-সবল মানুষের পক্ষেই জীবন নামের গাড়িটা ঠেলে নিয়ে যাওয়া কষ্টকর। আর ভাবুন তো, দুই পাবিহীন একটি ছিন্নমূল যুবক কীভাবে টিকে আছেন এই জগৎ সংসারে!
মোহাম্মদ আবদুল্লাহকে দেখে বিস্মিত হবেন যে কেউ। শরীরের অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গ হারিয়েও হার না-মানা এক চরিত্র তিনি। দুই পায়ের ঊরুর নিচের অংশ নেই। শুধু এ কারণেই আবদুল্লাহর জীবনকাহিনি হয়ে উঠতে পারে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। কিন্তু তাঁর পণ যেন সবাইকে আরও বেশি বিস্মিত করে দেওয়া। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, দুই পা ছাড়াই ফুটবল খেলেন আবদুল্লাহ!
গত মঙ্গলবার পল্টন ময়দানে শেষ হওয়া ওয়ালটন পথশিশু ফুটবল টুর্নামেন্টে খোঁজ মিলল এই লড়াকু আবদুল্লাহর। সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের জন্য দুই দিনের এই আয়োজনে খেলেছেন নাইন স্টার ক্লাবের জার্সি গায়ে। ওই ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন সগীর বলছিলেন পেছনের গল্পটা, ‘সদরঘাটে ছেলেটি কুলির কাজ করে। সেখান থেকে পল্টনে এসে ফুটবল খেলত। ওকে দেখে আমার খুব ভালো লেগে যায়। দুই পা থেকেও আমরা ভালো ফুটবল খেলতে পারি না। কিন্তু ছেলেটি পা ছাড়াই এত সুন্দর খেলতে পারে। এটা আল্লাহর অশেষ রহমত।’ সগীর বলতে থাকেন, ‘আমি নিজে পল্টনে খেলতে যেতাম, কিন্তু নিজের খেলা বাদ দিয়ে ওর খেলা দেখতাম। এভাবেই ছেলেটির প্রতি মায়া জন্মায় আমার এবং আমার টিমে নিয়ে নিই।’
আবদুল্লাহ খেলেন রক্ষণে। ঊরুর নিচে থেকে কেটে ফেলা অংশে কেডস পরেন এবং সেটা উল্টো করে। অর্থাৎ কেডসের সামনের দিকটা পেছনে আর পেছনের অংশ সামনে। এতে সুবিধা হলো, সামনের অংশটা দিয়ে বলে ‘পা’ ছোঁয়ানো যায়। আসলে তো ‘পা’ নয়, কেডস ছোঁয়ানো। কী আশ্চর্য, স্বাভাবিক ছেলেদের মতোই বল মারেন, রিসিভ করেন। আর তা দেখে বারবারই চোখ কচলাতে হয়, এসব সত্যি তো!
টুর্নামেন্টটা অনূর্ধ্ব-১৪ হলেও বিশেষ বিবেচনায় সুযোগ পেয়েছেন আবদুল্লাহ। ২২-২৩ বছরের পরিণত যুবক, শারীরিক সমস্যায় বয়সটা বোঝা যায় না। পুষ্টির অভাব স্পষ্ট। আবদুল্লাহর অবশ্য তা নিয়ে ভাবার সময় নেই। বেঁচে থাকাটাই যে ঢের বেশি! তাঁর এই বেঁচে থাকার গল্পটাও করুণ। শরীয়তপুরের বাড়ি থেকে ছোটবেলায় ঢাকায় এসে আশ্রয় মেলে কমলাপুরে। সেখানেই ২০০১ সালে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে পা দুটি আটকে যায় ট্রেন আর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে। জীবন বাঁচলেও কেটে ফেলতে হয় পা দুটি।
তবু পাবিহীন ‘নতুন জীবনে’ বাধা পেরোনোর গান গেয়ে চলেন আবদুল্লাহ। মানুষ যে তাঁর স্বপ্নের চেয়েও বড় কথাটিকে সার্থক রূপ দেন। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর সামনে তুলতে পারেনি বাধার দেয়াল। পল্টন মাঠে দর্শক কোলাহলের মধ্যে বলেন, ‘খেলতে ভালো লাগে, খেলার প্রতি আমার আগ্রহ আছে। তাই খেলি।’ ২০০৬ থেকে চলছে তাঁর ফুটবল খেলা। কোথায় কোথায় খেলেছেন জানতে চাইলে উত্তর আসে, ‘বরিশাল আর বাগেরহাটে গিয়ে ছোটদের টুর্নামেন্টে খেলেছি।’
কিন্তু পা ছাড়া ‘খেলতে’ সমস্যা হয় না? ফুটবল তো পায়েরই খেলা। আবদুল্লাহ খুব সহজে বলে দেন, ‘জি না, সমস্যা হয় না।’ মুখে না বললেও কষ্ট নিশ্চয়ই হয়। তাঁর মনে তো কষ্টের পাহাড়ই জমে থাকার কথা। কিন্তু আবদুল্লাহ আবারও অবাক করে দিয়ে বলেন, ‘আমার মনে ওই রকম কষ্ট নাই। কষ্ট মনে করলে কষ্ট।’ তাই সদরঘাটে পিকআপ, ট্রাক থেকে নামানো মালপত্র দোকানে দোকানে পৌঁছানোর কাজটাকে এখন কঠিন কিছু মনে হয় না তাঁর কাছে। দৈনিক দুই-তিন শ টাকা যা পান, তাতেই চালিয়ে নেন। কাজ না থাকলে টিভিতে বিদেশের ফুটবল দেখেন। রোনালদিনহোর খেলা খুব ভালো লাগত। এখন ভালো লাগে মেসি, নেইমার, রোনালদোর খেলা।
ফুটবল খেলে কী পাবেন জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘কী আর পামু...কিছুই পামু না...।’ জীবনটা নিঃসঙ্গ কাটে। টাকার অভাব আর শারীরিক সমস্যায় বাড়ি যাওয়া হয় না খুব একটা। চার ভাই, এক বোনের পরিবারে সবার বড় ছেলেটির জীবনের সব ফুলই আসলে শুকিয়ে গেছে। বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না মুঠোফোনের অভাবে। মাঝেমধ্যে বাড়ি গেলেই কেবল খোঁজখবর নিতে পারেন প্রিয়জনদের। কয়েক দিন থেকে আবার ফিরে আসেন সদরঘাটের জীবনে।
তবে পথশিশু ফুটবলের উদ্যোক্তা বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের প্রশাসক মোহাম্মদ ইয়াহিয়া মনে করেন, শারীরিক প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে ছেলেটির ঠাঁই হওয়া উচিত। সেখানে খেলাধুলা করার সুযোগ আছে। দুই পা হারিয়েও জীবনজয়ের এমন অবিশ্বাস্য চিত্রনাট্য লিখে চলেছেন যে তরুণ, ওটুকু তো তাঁর প্রাপ্যই।