চারদিকে কেবল পানি আর পানি। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—পানি সবখানেই। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমর অথবা বুকসমান পানি।
এক মাস ধরেই সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় এমন অবস্থা চলছে। তবে প্রায় দুই সপ্তাহে ধরে বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পার্শ্ববর্তী কুশিয়ারা নদীর পানি উপচে এ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।
আজ রোববার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদরের বাজারে অবস্থিত প্রায় ৭০০টি দোকানের মধ্যে অন্তত ৫০০টি দোকানে পানি ঢুকে পড়েছে। এ অবস্থায় বেচাকেনা বন্ধ রয়েছে। যেসব দোকানে একটু কম পানি ঢুকেছে, কেবল সেখানেই কিছুটা বেচাকেনা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এক মাসেও বন্যার পানি না কমায় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যার কারণে উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামের ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় বসবাস করছে। তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় সেখানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে উপজেলায় তিনটি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে ৫২টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া বন্যাদুর্গত মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রাণসামগ্রীও বিতরণ করা হচ্ছে।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী ফখরুল ইসলাম জানান, এমনিতে প্রতিদিন তাঁর দোকানে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বিক্রি হতো। কিন্তু মাস খানেক আগে বন্যা দেখা দেওয়ার পর থেকে তাঁর দোকানে গড়ে ২০ টাকাও বিক্রি হচ্ছে না। দোকানে পানি ঢুকে পড়ায় তিনি মেঝেতে কয়েক দফা ইট ফেলে কোনো রকমে দোকানঘরে চলাফেরা করছেন। এ ছাড়া দোকানে পানি ঢোকায় সাপের উপদ্রবও বেড়েছে।
শাহীন আহমদ নামের সদরের এক বাসিন্দা জানান, তাঁর বাসায় হাঁটুসমান পানি। এ কারণে ঘরে কিছু ইট ফেলে, তার ওপর কয়েকটি চৌকি বিছিয়ে কোনো রকমে মাচা বেঁধে বসবাস করছেন। তবে ঘরে দুটি শিশু থাকায় তাঁর চিন্তা বেশি হচ্ছে। কখন জানি তারা পানিতে পড়ে যায়, এ নিয়ে তাঁর দুর্ভাবনা হচ্ছে। এ ছাড়া রান্নাবান্না করতেও তাঁদের সমস্যা হচ্ছে।
এক মাস ধরে মানুষের এই দুর্ভোগের কারণ প্রসঙ্গে সিলেটের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভারতের আসামের বরাক উপত্যকায় সম্প্রতি ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। তাই কুশিয়ারার পানি এখন উপচে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।’ তিনি বলেন, বৃষ্টি না কমলে বন্যা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো উপায় নেই।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হুরে জান্নাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপজেলা সদরের পার্শ্ববর্তী কুশিয়ারা নদীর পানি মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় উপজেলাজুড়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তবে বন্যার্ত মানুষের প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে উপজেলা প্রশাসন আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তাই দুর্ভোগ তো কিছুটা হবেই।’
নয় উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত: সিলেটের ১৩ উপজেলার মধ্যে নয় উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে নদী ও হাওরের পানি বেড়ে গিয়ে সৃষ্ট বন্যা আজ রোববার অপরিবর্তিত ছিল। আজ বেলা পৌনে পাঁচটা পর্যন্ত সিলেটে নতুন কোনো গ্রাম প্লাবিত না হলেও জেলার বিয়ানীবাজার, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, গোলাপগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, সিলেট সদর ও দক্ষিণ সুরমায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত ছিল।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে, নয়টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঘটনায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। জেলায় নয়টি আশ্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ৮৯টি পরিবারকে আবাসনসুবিধা করে দেওয়া হয়েছে। এসব পরিবারকে খাদ্য, চিকিৎসাসহ সব ধরনের আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। তবে স্থানীয় লোকজনের মতে, জেলায় পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ হবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. রাহাত আনোয়ার প্রথম আলোকে জানান, বিশেষ করে নদীতীরবর্তী এলাকার গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে বেশি। বন্যার্ত মানুষের সহায়তায় তাৎক্ষণিকভাবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১২৭ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। প্রয়োজনে এ সহায়তা আরও বাড়ানো হবে।