
এক দিন আগেই টেলিভিশনে বনানীর অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা দেখেছেন আবদুর রাশিদ। শনিবার ভোরে তাঁর ঘুম ভেঙেছে আরেকটি আগুনের খবর শুনে। এবার আগুন লেগেছে তাঁর মুদি ও সবজির দোকানে। খবর পেয়ে তড়িঘড়ি বাড্ডার বাসা থেকে ছুটে এসে দেখেন সব পুড়ে শেষ। পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে জীবিকা নির্বাহের সম্বল।
এর আগে ২০১৭ সালের আগুনেও পুড়েছিল রাশিদের গুলশান-১ ডিএনসিসি মার্কেটের দুটি দোকান। বিভিন্ন এনজিও আর আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে নতুনভাবে দোকান সাজিয়েছিলেন। গত শনিবারের দ্বিতীয় দফার আগুন দিশেহারা করে দিয়েছে তাঁকে। দিনের পর দিন পরিশ্রম করে গড়ে তোলা দোকানটি পুড়তে দেখে রাশিদের বুকের ভেতর যে হাহাকার করে ওঠে, সেটা যেন বুক চাপড়েও থামানো যায় না।
গতকাল রোববারও পুড়ে যাওয়া দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার দুহাত বুকের ওপর রেখে বলছিলেন, ‘কয়েক লাখ টাকার ঋণ আছে। কীভাবে শোধ করব। আমি তো নিঃস্ব হয়ে গেলাম।’
দুদিন আগেও সবকিছু পরিকল্পনামাফিক চলছিল শফিকুল ইসলামের। এই মার্কেটে ছোট দুই ভাই ও তাঁর দুটি ফল ও একটি রেক্সিনের দোকান ছিল। এগুলোর আয় আর কিছু জমানো টাকা দিয়ে মা আয়শা আক্তারকে হজে পাঠাতে চেয়েছিলেন। মা হজ থেকে ফিরলে বোনের বিয়ে দেবেন। এ নিয়ে টুকটাক আলাপও চলছিল। গতকাল সকালে শফিকুলকে দেখা গেল দোকানের ধ্বংসস্তূপ থেকে লোহার ফ্রেম বের করতে। উদ্দেশ্য, এগুলো বেঁচে যদি কিছু টাকা পাওয়া যায়। একটু দূরে আড়াল থেকে ছেলের এই কাজ দেখছিলেন শফিকুলের মা আয়েশা আক্তার। তিনি বলছিলেন, ‘ছেলেরা চায় না আমি দোকানে এসে এই অবস্থা দেখি। কিন্তু কী করব, মন মানে না। আমি এখন হজে যেতে চাই না। শুধু ছেলেরা ক্ষতিটা কাটিয়ে উঠুক, এই দোয়া করি।’
ডিএনসিসি মার্কেটে মোট দোকান ২৯৩টি। এর মধ্যে পুড়ে গেছে ২১১টি। স্টিলের ছাদ আর লোহার ফ্রেমের মার্কেট। বেশির ভাগ দোকানেই বিক্রি হতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, প্রসাধনী ও গৃহস্থালির সরঞ্জাম। গতকাল দুপুরে মার্কেটের কিছু কিছু অংশের আধপোড়া পণ্য থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। কোথাও কোথাও জমে ছিল আগুন নেভানোর পানি।
চোখের পানি মুছতে মুছতে পুড়ে যাওয়া নিজের ক্রোকারিজের দোকানের ভেতর কিছু একটা খুঁজছিলেন রাবেয়া সুলতানা। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার স্বামীর এক হাত অকেজো। চার মেয়ের সংসার একাই টানতে হয় তাঁকে। ২০১৭ সালে স্বামীর অনুরোধে বাবার বাড়ি থেকে তিন লাখ টাকা এনে দোকানের মালামাল কিনেছিলেন। এর ঠিক তিন মাসের মাথায় আগুন লাগে মার্কেটে। পুড়ে যায় ৩৫ লাখ টাকার মালামাল। নতুন করে ধার নিয়ে আবার শুরু করেন সবকিছু। কিন্তু দেড় বছরের ব্যবধানে আবারও সব হারাতে হবে, তা কল্পনাতেও ছিল না তাঁর। তিনি বলছিলেন, ‘সামনে আগানোর আর কোনো পথ নেই। পরিচিত এনজিওতে কয়েক লাখ টাকার লোন আছে। তারা দোকানের অবস্থা দেখে লোন দিয়েছিল। এখন তো সব ছাই। ছাই দেখে কী লোন দেবে?’
ধ্বংসাবশেষ থেকে উত্তরণের উপায় জানা নেই মার্কেটের সবচেয়ে বড় দোকান জিয়া জেনারেল স্টোরের পরিচালক আনোয়ার হোসেনেরও। তাঁর চার ভাইয়ের পাশাপাশি ছয়টি দোকান।
আনোয়ার বলছিলেন, ‘দুইবারের আগুনে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় চার কোটি। ৩০ বছর ধরে দোকান চালিয়েও নিজের জন্য টাকা জমাতে পারিনি। মালামাল কেনা থেকে সবকিছুই ঋণের টাকায় করা। ঋণ করে দোকানে মালামাল তুলি আর আগুন এসে ছাই করে দেয়।’
গতকাল দুপুরেও মার্কেটের ধ্বংসস্তূপ থেকে খুঁজে খুঁজে পুড়ে না যাওয়া পণ্য বের করছিলেন কিছু দোকানি। মার্কেটের বাইরে বসা অস্থায়ী বাজারে বিক্রি হচ্ছিল সেগুলো। যেন ছাই-কয়লার ভেতর থেকে বাঁচার আবার এক নতুন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।