
নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) বিভিন্ন কর্মসূচিতে কর্মরত প্রায় ছয় হাজার কর্মী। বিআরডিবি প্রান্তিক পর্যায়ে যে ঋণ দেয়, তা গ্রহীতাদের কাছ থেকে সুদসহ আদায় করেন এসব কর্মী। আর সুদের একটি অংশ বেতন হিসেবে পান তাঁরা। ‘আয় থেকে দায় মেটানোর’ এই ব্যবস্থার অবসান, চাকরি স্থায়ী করাসহ কয়েক দফা দাবিতে বিআরডিবির বিভিন্ন কর্মসূচিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তিন মাস ধরে আন্দোলন করছেন।
বিআরডিবিতে দুই ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। রাজস্ব খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-ভাতাসহ সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা পান। বর্তমানে রাজস্ব খাতে পদ আছে ৩ হাজার ৪০৬টি। আর কর্মসূচির মাধ্যমে উন্নয়ন খাতের কর্মীরা ঋণের সুদ থেকে একটি অংশ বেতন হিসেবে পান। এর বাইরে অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। বিআরডিবি কর্মচারী সংসদের (সিবিএ) হিসেবে, বর্তমানে উন্নয়ন খাতে প্রায় ছয় হাজার কর্মী আছেন।
বিআরডিবির ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিআরডিবির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ১১টি কর্মসূচি চলমান রয়েছে। এসব কর্মসূচিতে বরাদ্দ করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে ৯১৬ জন, পল্লী প্রগতি কর্মসূচিতে ৫৫৮ জন, উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে ৫৮০ জন, পল্লী জীবিকায়ন কর্মসূচিতে ২ হাজার ১৫০ জন, দরিদ্র মহিলাদের জন্য সমন্বিত কর্মসংস্থান সহায়তা কর্মসূচিতে ৩১৯ জন কর্মরত আছেন। এর বাইরে দুস্থ পরিবার উন্নয়ন সমিতি, মহিলা বিত্তহীন কেন্দ্রীয় উন্নয়ন সমিতি, সমন্বিত দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি, গ্রামীণ মহিলাদের উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান কর্মসূচি, গ্রামীণ মহিলাদের উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান ও সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি, আবর্তক কৃষিঋণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে।
>উন্নয়ন খাতের কর্মীরা প্রান্তিক পর্যায়ে ঋণ বিতরণ করেন
তাঁদের বেতন হয় ঋণের সঙ্গে আদায় করা সুদের একটি অংশ থেকে
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে সরকার সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি (আইআরডিপি) নামে একটি প্রকল্প শুরু করে। ১৯৮২ সালে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইআরডিপিকে বোর্ডে রূপান্তর করা হয়, যা বর্তমানে ‘বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)’ নামে পরিচিত। বিআরডিবি ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণে দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মাঠপর্যায়ের কাজ মূলত উন্নয়ন খাতের কর্মীরাই করে থাকেন। বিআরডিবির ঋণের সুদহার ১১ শতাংশ। আদায় করা সুদের ৭ শতাংশ কর্মীরা বেতন হিসেবে পান।
বিআরডিবি সূত্র জানায়, দুস্থ পরিবার উন্নয়ন সমিতির প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ১৯৮২ সালের জুলাই থেকে ১৯৯৩ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু এরপরও প্রকল্পটি কর্মসূচি হিসেবে বিআরডিবি চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পের কর্মীরাই এখন এই কর্মসূচি পরিচালনা করছেন। একইভাবে অন্য প্রকল্পগুলোও কর্মসূচি হিসেবে চলমান রয়েছে। শুরুতে এসব প্রকল্পের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কর্মীদের চাকরি রাজস্ব খাতে নেওয়া হবে, কিন্তু সেটি হয়নি।
বিআরডিবির সিবিএ সভাপতি আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি ঋণের মাধ্যমে গরিব মানুষের ভাগ্যবদল হলেও কর্মসূচিতে কর্মরতদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আয় থেকে দায় মেটানোর ব্যবস্থার কারণে কর্মীরা নিয়মিত বেতন–ভাতা পাচ্ছেন না। চাকরি রাজস্ব খাতে নেওয়ার দাবিতেই মূলত তাঁরা আন্দোলন করছেন।
গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আন্দোলন করছেন বিআরডিবির বিভিন্ন কর্মসূচির কর্মীরা। প্রথমে টানা ৬৭ দিন কারওয়ান বাজারের বিআরডিবি পল্লী ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। এরপর ১২ নভেম্বর থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে লাগাতার গণ–অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। এর মধ্যেই গত ২৮ নভেম্বর ২৮ জন আন্দোলনকারীর নাম উল্লেখ করে তেজগাঁও থানায় মামলা করেছে বিআরডিবি কর্তৃপক্ষ। মামলার এজাহারে সরকারি কার্যক্রমে বাধাদান, কর্মকর্তাদের নাজেহাল করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে দেখা যায়, দুই শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ফুটপাতে বসে আছেন। ব্যানার-প্ল্যাকার্ডে চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে স্লোগান লেখা। আন্দোলনকারীদের পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির মাঠ সংগঠক খন্দকার মোসাদ্দেক এলাহী। তিনি যশোর সদর উপজেলায় ২৪ বছর ধরে দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করছেন। তাঁর দুই মেয়ের একজন কলেজে, অন্যজন স্কুলে পড়ে। মোসাদ্দেক বলেন, ‘চাকরির বয়স দুই যুগ পার হলেও সাকল্যে বেতন ১৬ হাজার টাকা। তা–ও সমিতির কিস্তির টাকা তুলতে পারলে বেতন। আর না হলে মাস শেষে ফিরতে হয় খালি হাতে। সন্তানদের মুখের দিকে তাকাতে পারি না।’
এর আগে একাধিক প্রকল্পের জনবলকে রাজস্ব খাতে নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্মতি দিয়েছিল। ২০১২ সালে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির ১ হাজার ৭৫ জনকে, ২০১৩ সালে উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান কর্মসূচির ৫৫৩ জনকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরে সম্মতি দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু বিআরডিবি কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ না নেওয়ায় এই কর্মীরা রাজস্ব খাতে যেতে পারেননি।
বিআরডিবি কর্তৃপক্ষ বলছে, রাজস্ব খাতে জনবল বাড়াতে ১৩ হাজার ২২৫টি পদ সৃজনের আবেদন করা হয়েছে। নতুন পদের অনুমোদন পাওয়া গেলে উন্নয়ন খাতের কর্মীদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে আত্তীকরণের মাধ্যমে রাজস্ব খাতে নেওয়া হবে। বিআরডিবির মহাপরিচালক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বিআরডিবিকে স্বল্প সুদে আরও দেড় হাজার কোটি টাকা ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অনুরোধ করা হয়েছে। এই টাকা পাওয়া গেলে সংগঠকদের ঋণসীমা বাড়ানো যাবে। তাতে সংগঠকদের আয় অনেকটা বাড়বে। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে কাজ করে আসা উন্নয়ন খাতের কর্মীদের সমস্যা সমাধানে তাঁরা আন্তরিক। তবে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।