আসমা বেগম ভৈরব পোস্ট অফিসে ১০ বছর মেয়াদি দেড় লাখ টাকা মূল্যের সঞ্চয়পত্র কেনেন। মেয়াদ পূর্ণ হতে আর ২০ মাস বাকি। মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। এখন তাঁর টাকার খুবই প্রয়োজন। তাই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার হিসাব-নিকাশ বাদ দিয়ে এখন তিনি সমুদয় মূলধন উত্তোলন করতে চান। কিন্তু অনেক ধরনার পরও টাকা হাতে পাচ্ছেন না।
ডাকঘর থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, সঞ্চয়পত্র বিক্রি বন্ধ। তাই আয় একদম তলানিতে ঠেকেছে। এ কারণে সব গ্রাহকের সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবারও সঞ্চয়পত্রের টাকার জন্য ডাকঘরে যান আসমা বেগম। দুপুর পৌনে ১২টায় পোস্টমাস্টার কার্যালয়ে দেখা যায় তাঁকে। পোস্টমাস্টার আ. রহমানের উদ্দেশে আকুতি রেখে তিনি বলছিলেন, ‘স্যার মেয়ের বিয়া। আজ টাকা না নিয়া যামুই না।’
বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত ভৈরব ডাকঘরে অবস্থান করে দেখা যায়, টাকা না থাকায় আসমার মতো দেড় শতাধিক গ্রাহক দীর্ঘ অপেক্ষার পর খালি হাতে বাড়ি ফিরে গেছেন। টাকা না পাওয়ায় বেশ ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত ছিলেন গ্রাহকেরা। এই নিয়ে বেশ বিব্রত কর্মরতরাও।
কাকলি বেগম নামের এক নারী সঞ্চয়পত্রের গ্রাহক। তিনি ভুক্তভোগী লোকজনের একজন। কাকলি বলেন, ‘এই নিয়ে তিন দিন এলাম। তিন দিনই টাকা নেই শুনতে হলো।’
ডাকঘর সূত্র জানায়, একসময় চিঠি আদান-প্রদান ডাকঘরের প্রধান কাজ এবং আয়ের উৎস হলেও এখন তা আর নেই। বর্তমানে আয়ের খাত হলো সঞ্চয়পত্র বিক্রি, স্থায়ী আমানত (এফডিআর), সঞ্চয়, ডাক জীবনবিমা, রাজস্ব টিকিট ও ডাকটিকিট বিক্রি। সবচেয়ে বেশি আয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে। এই ডাকঘরে সব খাত মিলে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ১২ হাজার। সঞ্চয়পত্র লভ্যাংশ প্রদানসহ দৈনিক দরকার প্রায় কোটি টাকা। এটা দিয়ে এত দিন ৫০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া যেত। কিন্তু সমস্যার শুরু ৩১ জুলাইয়ের পর থেকে। ওই সময় কর্তৃপক্ষ এক চিঠিতে পোস্টমাস্টারদের অবগত করে, নতুন বিধিমালা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত যেন সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা না হয়। এই কারণে এই খাতে আয় এখন শূন্যের ঘরে। বর্তমানে শুধু এফডিআর থেকে কিছু টাকা আয় হচ্ছে।
একই সূত্র জানায়, ডাকঘরে টাকার সংকট হলে বিধান হলো জেলা কার্যালয়ের কাছে লিখিতভাবে চাহিদা পাঠাতে হয়। জেলা কার্যালয় চিঠির মাধ্যমেই ডিডি করে টাকা পাঠিয়ে থাকে। বর্তমানে জেলা কার্যালয় চাহিদার অর্ধেক টাকা পাঠাচ্ছে। তাও জানানোর চার দিনের আগে তা এসে পৌঁছাচ্ছে না। ভৈরব ডাকঘরের অস্থিরতার এই প্রভাব পড়েছে গ্রাহকদের মনে। সেই কারণে এফডিআর করার সুযোগ থাকলেও গ্রাহকেরা সুযোগটি নিচ্ছেন না।
এফডিআর বিভাগের দায়িত্বে থাকা তোফাজ্জল হোসেন জানালেন, কেন জানি কয়েক দিন ধরে নতুন করে এফডিআর করার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। তিনি জানান, রোববার এফডিআর হয়েছে ৮টি। এই থেকে এসেছে ৩৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। বৃহস্পতিবার ২ লাখ টাকা মূল্যের এফডিআর হয়েছে মাত্র একটি। এই আয় দিয়ে কোটি টাকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন।
ফাতেমা আলম নামের এক নারী লাইনে দাঁড়িয়ে হইচই শুরু করে দিয়েছেন। কারণ চার দিন আগেও একবার এসে তিনি বিমুখ হয়ে গেছেন। ফাতেমা সঞ্চয়ী গ্রাহক। ফাতেমা আলম বলেন, সমস্যা হলে এক দিন হতে পারে। এক সপ্তাহের অধিক সময় পেরিয়ে যাবে, এই সময়ের মধ্যে সমস্যা সমাধান করতে না পারাটা রীতিমতো অন্যায়।
আ. কাদির নামের একজন গ্রাহক পোস্টমাস্টারের মাথার কাছে দীর্ঘ সময় ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে। কিছুদিন আগে তাঁর পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এখন মূলধন উত্তোলন করতে এসে তিনিও একই বিপত্তির মধ্যে পড়েছেন। আ. কাদির বলেন, ‘আস্থাহীনতায় ভুগছি। না জানি কোন দিন সমস্যার সমাধান হয়।’
চোখের সামনে দীর্ঘ সারি। হাতে সঞ্চয়পত্রের বই। অসহায়ভাবে গ্রাহকদের হইচই সহ্য করে যাচ্ছেন টাকা প্রদানকারী আলমগীর হোসেন ও সাহানা আক্তার। আলমগীর হোসেন বলেন, ‘গ্রাহকদের হাতে যখন টাকা তুলে দিই, তখন তাঁদের মুখে এক ধরনের আনন্দের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। এখন হয়েছে উল্টো।’ সাহানা বেগম বলেন, এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া খুবই কঠিন।
ডাকঘরের ভেতর ও বাইরের উত্তপ্ত পরিবেশে বেশ বিচলিত পোস্টমাস্টার আ. রহমান। তিনি বলেন, সমস্যাটা হয়েছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে না পারায়। এখানে প্রতিদিন কোটি টাকা প্রয়োজন। প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জেলা কার্যালয় থেকে টাকা পেতে সময় লেগে যাচ্ছে।
সঞ্চয়পত্র বিক্রি বন্ধ থাকার কারণ জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ জেলা ডাকঘরের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল আ. মালেক বলেন, বন্ধ নয়, অনলাইনে চালু রয়েছে। পোস্ট অফিসে পাসওয়ার্ডজানানোর মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র বিক্রি প্রক্রিয়া চালু রাখা আছে। অর্থসংকট দূর করার বিষয়ে তাঁর বক্তব্য হলো, নিজস্ব আয় কমে গেলে চাহিদা জানানোর মাধ্যমে জেলা কার্যালয় থেকে টাকা এনে সমস্যার সমাধান করতে হয়। তাঁর পরামর্শ হলো, ভৈরব পোস্টমাস্টার যেন প্রয়োজনীয় চাহিদার কথা জানান। তাহলেই জোগান মিলবে।
অনলাইনে সঞ্চয়পত্র বিক্রির বিষয়ে নির্দেশনা কিংবা পাসওয়ার্ড পাননি বলে জানান পোস্টমাস্টার।