মাদক মামলার আসামিরা ৮ কারণে খালাস পাচ্ছেন

ত্রুটিপূর্ণ এজাহার ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষী উপস্থাপনে ব্যর্থতাসহ আট কারণে মাদক মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। গত এক দশকে নিষ্পন্ন হওয়া মামলা পর্যালোচনা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এই কারণগুলো চিহ্নিত করেছে; যা সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এক চিঠিতে জানানো হয়েছে।

অন্য কারণগুলো হলো, মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা একই ব্যক্তি হওয়া, আইনের বিধান অনুযায়ী জব্দ তালিকা তৈরি না করা, জব্দ তালিকার সাক্ষীদের সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্যে অমিল, বাদী ও অভিযানকারী দলের সদস্যদের বক্তব্যে অমিল, আদালতে সাক্ষী হাজিরে ব্যর্থতা এবং অনেক ক্ষেত্রে মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তাও সাক্ষ্য দিতে আসেন না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০০৯ থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ১০ বছরে সারা দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের করা ২৬ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ মামলাই রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এসব মামলার ১৪ হাজার ৬৬৫ জন আসামি খালাস পান, যা মোট আসামির ৫১ শতাংশ।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অভিযান) পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আ ফ ম মাসুম রব্বানী প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার গাফিলতি, জব্দ তালিকার দুর্বলতা, আদালতে ঠিকমতো সাক্ষ্য না দেওয়ায় মূলত মাদক মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন।

২০১০ সালের ২৪ মে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদকসহ গ্রেপ্তার এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পিরোজপুর থানায় মামলা করে। সাত বছর পর, ২০১৭ সালের ৩১ মে পিরোজপুরের বিচারিক হাকিম আদালত ওই মামলার রায়ে আসামিকে খালাস দেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, মামলার বাদী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা একই ব্যক্তি। তিনি উভয় ভূমিকায় সাক্ষ্য দেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হওয়ায় তাঁকে নিরপেক্ষ সাক্ষী বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। পর্যাপ্ত সময় পাওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রপক্ষ সব সাক্ষীকে আদালতে হাজির না করায় আসামিপক্ষ সুবিধা পেয়েছে। আসামিকে মাদকসহ হাতেনাতে আটক করার বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি। 

>১০ বছরে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার ৪৮.৪৫% প্রমাণিত হয়নি
খালাস পেয়েছেন ৫১.১৮ শতাংশ আসামি
এখন তদন্তাধীন ৫৫,৮৪৩টি মামলা

​
আরেকটি মামলার পাঁচ বছর বিচারকাজ চলার পর ২০১৭ সালের ২০ জুলাই রায় ​দেন বরিশালের যুগ্ম দায়রা জজ আদালত। তাতে দুই আসামি খালাস পান। আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, দুই আসামির কাছ থেকে গাঁজা উদ্ধার করা হলেও জব্দ তালিকার সাক্ষীরা গাঁজা উদ্ধারের পক্ষে সাক্ষ্য দেননি। কেবল পুলিশ সদস্যদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

১৩ বছর বিচারকাজ শেষে ২০১৬ সালের ২১ মার্চ সিলেটের যুগ্ম দায়রা জজ আদালত আসামিকে খালাস দিয়ে একটি মাদক মামলার রায় দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ ঘটনাস্থলের, এজাহারের, অভিযোগপত্রের ও জব্দ তালিকায় উল্লিখিত সাক্ষী আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে আসামি খালাস পেয়েছেন।

একইভাবে ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা রাজধানীর দক্ষিণখানে ৫০০ ইয়াবা বড়িসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেন। গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতে এই ঘটনায় করা মামলার রায় হয়। রাষ্ট্রপক্ষ মামলা প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় পাঁচ আসামির সবাই খালাস পান। ওই মামলার বাদী এ কে এম কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মূল আসামি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। সাক্ষীরা আদালতে গিয়ে আসামিদের পক্ষেই সাক্ষ্য দেন।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মো. আবদুল্লাহ আবু প্রথম আলোকে বলেন, অনেক সময় মাদক মামলার আসামিরা সাক্ষ্য দিতে যান না; আবার গেলেও আসামির প্রভাবিত হয়ে তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দেন। একইভাবে জব্দ তালিকার সাক্ষীরা আসামিদের পক্ষ অবলম্বন করেন। তাঁর মতে, দ্রুত অভিযোগপত্র দিলে মামলার দ্রুত বিচার শেষ হবে। সে ক্ষেত্রে আসামিরা সাক্ষীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে পারবেন না। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মাদক মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে আবার একই পেশায় ফিরছেন। মামলায় সফলতা অর্জনের মৌলিক প্রশিক্ষণ নেই তদন্তকারীদের। এই অবস্থায় সারা দেশে এখন যে ৫৫ হাজারের বেশি মামলা তদন্তাধীন আছে, সেগুলোর কতটা শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হবে, তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আসামিরা যাতে আদালত থেকে খালাস না পান, তা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে সমন্বিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার পুলিশ স্টাফ কলেজে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাঁরা বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণেও অংশ নিচ্ছেন। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ জোরদার হয়েছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে আসামি খালাস পাওয়ার কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করে সেটি কাটিয়ে ওঠার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই অধিদপ্তরের জনবলও দ্বিগুণ হচ্ছে। এর ​ফলে তদন্তাধীন মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করা যাবে।