প্রথম আলো ও মাহিন্দ্র কমভিভার মোবাইল ব্যাংকিং–বিষয়ক গোলটেবিল

মোবাইল ব্যাংকিং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি এনেছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার আওতায় যত লেনদেন হয়, তার সিংহভাগই ব্যক্তিকেন্দ্রিক লেনদেন। সহজে ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে অর্থ স্থানান্তরে এ সেবার সর্বাধিক ব্যবহার হচ্ছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবার আওতায় আনা হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়েছে।
বাস, ট্রেনের টিকিট কাটা থেকে শুরু করে পাড়ার দোকানে কেনাকাটা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনসহ বিভিন্ন ধরনের ফি পরিশোধসহ আর্থিক লেনদেনের নানা ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সুফল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এখন এটি সীমিত পরিসরে হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রসারের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন খাতটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রথম আলো ও মাহিন্দ্র কমভিভার যৌথ উদ্যোগে গতকাল বুধবার আয়োজিত ‘মোবাইল ব্যাংকিং: সম্ভাবনা ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তার দিকটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে আলোচনায়। সাম্প্রতিক সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের ঘটনার যাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচকদের বক্তব্যে ঘুরেফিরে উঠে আসে। তাঁরা বলেন, ঝুঁকি থাকবেই, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করেই সেই ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে। গোলটেবিল আলোচনা সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা যত দ্রুত বাড়ে, তার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রসারের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটাকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর সেবার প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি ঝুঁকি মোকাবিলার মতো প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা দরকার।

ইব্রাহিম খালেদ আরও বলেন, যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনে একধরনের ঝুঁকি থাকে। ঝুঁকির দায় যাতে গ্রাহকের ঘাড়ে না পড়ে, সে জন্য আর্থিক ঝুঁকিসংক্রান্ত বিষয়গুলো ব্যাংকের হাতে থাকাই সমীচীন। এ সময় তিনি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল ‘মোবাইল ব্যাংকিং: সম্ভাবনা ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা প্রথম আলো

সম্ভাবনার দিকটিও তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে গ্রাহকেরা কোনো হয়রানি বা প্রতারণার শিকার হলে সুনির্দিষ্টভাবে যাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) গ্রাহক অভিযোগ সেল চালুর সুপারিশ করেন।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের পরিচালক লে. কর্নেল (পিএসসি) মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে থাকা দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার লক্ষ্যে মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস চালু করা হয়েছিল। এ সেবার খাতটির বয়স খুব বেশি দিন হয়নি। এরই মধ্যে আমরা প্রাথমিক পর্যায়টি ভালোভাবে অতিক্রম করেছি। এখন বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে এ খাতকে এগিয়ে নিতে হলে দরকার একটি ‘সামগ্রিক নীতি’।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব টি আই নুরুল কবির বলেন, বিশ্বজুড়ে এখন তথ্যপ্রযুক্তি হচ্ছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের শুরুর ধাপটি এরই মধ্যে আমরা অতিক্রম করেছি। এখন সময় এই সেবা প্রসারের বিপুল সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো। এ জন্য দরকার বাজারমুখী একটি নীতি সহায়তা। যেখানে ব্যাংকের পাশাপাশি মোবাইল ফোন অপারেটরাও যৌথভাবে এ ব্যাংকিং সেবায় যুক্ত হতে পারে।

বিকাশের করপোরেট অ্যান্ড এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা একটি নতুন খাত। এ খাতের গ্রাহকদের বেশির ভাগই অত্যন্ত দরিদ্র ও মূলধারার ব্যাংকের আওতাবহির্ভূত। তাই এদের প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের মতো ‘আপনার গ্রাহককে জানুন বা কেওয়াইসি’ কড়াকড়িতে আনা হলে সে ক্ষেত্রে সেবা গ্রহণে তাদের অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে। তবে এটাও ঠিক, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণা কমাতে হলে গ্রাহকের পরিচিতি নিশ্চিত হওয়াটাও জরুরি।

দি সিটি ব্যাংকের চিফ ইনফরমেশন অফিসার কাজী আজিজুর রহমান বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে গ্রাহকের পরিচিতি নিশ্চিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। ফলে এ ধরনের ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকিও বেশি। যদিও বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রসারের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে মোবাইল ফোনের সিম নিবন্ধনে আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করায় তা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য সহায়ক হবে বলে মত দেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক প্রজ্ঞা পারমিতা সাহা বলেন, ‘যদিও আমরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কথা বেশি বলছি। আসলে এটি মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস। বর্তমানে এটির প্রথম পর্যায় পার করছি। এখন গ্রাহকসংখ্যা প্রায় তিন কোটি। দ্বিতীয় পর্যায়ে সেবার পরিধি বাড়ানোই আমাদের লক্ষ্য। তবে এ ক্ষেত্রে গ্রাহক সচেতনতার দিকটিও খুবই জরুরি। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য গ্রাহক পরিচিতি ফরমটি খুবই ছোট ও সহজ করা হয়েছে।’

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিভাগের প্রধান আবুল কাশেম খান বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং এখন অনেকটাই মূল ধারার ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। যদিও মোবাইল ব্যাংকিংয়ে আমাদের ব্যাংক এখনো লাভের মুখ দেখেনি। কারণ, এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউশননির্ভর এ ব্যবসায় ডিস্ট্রিবিউশন খরচ অনেক বেশি।

সিটিও (চিফ টেকনোলজি অফিসার) ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তপন কান্তি সরকার বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আওতায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে অর্থের যে লেনদেন হয়, তার বিপরীতে যদি গ্রাহকের নিজস্ব কোনো অ্যাকাউন্ট বা হিসাব না থাকে, তাহলে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের লেনদেন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে এ কথা সত্য, এ দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সম্ভাবনার একটি দ্বার খুলে দিয়েছে।

মাহিন্দ্রা কমভিভার কান্ট্রি ম্যানেজার রিয়াদ হাসনাইন বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের আর্থিক লেনদেনের সুবিধা চালু করা উচিত। ভবিষ্যতে ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ অনেক বাড়বে। সে জন্য এখনই এ ধরনের সেবার মান ও নিরাপত্তা জোরদার করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

শিওর ক্যাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহাদত উল্লাহ খান বলেন, যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে শুধু মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করা সম্ভব। এ ছাড়া নানা ধরনের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনকে পয়েন্ট অব সেল বা পস হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

গ্রামীণফোনের ফাইন্যান্স সার্ভিসেস বিভাগের সিনিয়র স্পেশালিস্ট রাশেদা সুলতানা বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসির আরও নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের যে কেওয়াইসি তথ্য নেওয়া হয়, সেটিকে আরও সহজ করা উচিত। এ ধরনের ব্যবসায় অনেক পক্ষের সম্পর্ক থাকে। সবাইকে কীভাবে একই ছাতার নিচে এনে ঝুঁকিমুক্তভাবে এ ব্যবসার প্রসার ঘটানো যায়, সেটি ভাবতে হবে।

এক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের নীতি বিশ্লেষক ইশতিয়াক হুসেইন বলেন, বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারকে পেছনে রেখে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় সরকারি বিভিন্ন সুবিধা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে দ্রুত ও সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।