সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পর এবার রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, সংসদ সদস্যসহ সাংবিধানিক ১৫টি পদে পারিতোষিক বা বেতন প্রায় দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোর সঙ্গে সংগতি রেখে এই বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে।
এতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বেতন বেড়েছে ৯৬ শতাংশের বেশি। আর সংসদ সদস্যদের বেড়েছে শতভাগ। এর সঙ্গে বিভিন্ন পদে অন্যান্য ভাতাও বেড়েছে। সর্বশেষ ২০০৯ সালে এসব পদে বেতন বাড়ানো হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে গতকাল এ অনুমোদন দেওয়া হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, চিফ হুইপ, আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক, প্রতিমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় উপনেতা, হুইপ, উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ছয়টি অধ্যাদেশের খসড়া সংশোধনী প্রস্তাবের অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশারারফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের বলেন, অর্থবিল হওয়ায় এগুলো অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। এরপর বিলগুলো জাতীয় সংসদে পেশ করা হবে। এতে চলতি ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন এবং ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির বেতন বর্তমান ৬১ হাজার ২০০ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার এবং প্রধানমন্ত্রীর বেতন ৫৮ হাজার ৬০০ থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকায় উন্নীত হবে। আকাশপথে ভ্রমণে রাষ্ট্রপতির বিমাসুবিধা ১৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৭ লাখ টাকা করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতির বর্তমান স্বেচ্ছাধীন তহবিল দুই কোটি টাকা অপরিবর্তিত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রীর জন্য আকাশপথে ভ্রমণে বিমাসুবিধা ১৪ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২৫ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাঁর স্বেচ্ছাধীন তহবিল এক কোটি থেকে বাড়িয়ে দেড় কোটি টাকা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি বাড়িতে থাকলে প্রতি মাসে ভাড়া বাবদ পাবেন ১ লাখ টাকা, যা আগে ছিল ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে গেলে প্রধানমন্ত্রীর দৈনিক ভাতা এক হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার টাকা করা হয়েছে।
স্পিকারের বেতন ৫৭ হাজার ২০০ থেকে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। স্পিকারের ব্যয় নিয়ামক ভাতা ৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১৩ হাজার টাকা হচ্ছে। স্পিকারের বিমান ভ্রমণের বিমার সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬ লাখ, দৈনিক ভাতা ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ এবং স্বেচ্ছাধীন তহবিল সাড়ে ৪ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১১ লাখ টাকা করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির বেতন ৫৬ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির ব্যয় নিয়ামক ভাতা ৭ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকা করার পাশাপাশি ‘ডোমেস্টিক এইড’ ভাতা ১ হাজার ৬২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। তিনি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করলে এর খরচ ১৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা এবং ব্যক্তিগত বা সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করলে ভাতার পরিমাণ এক হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার টাকা করা হয়েছে।
মন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা, চিফ হুইপ এবং আপিল বিভাগের বিচারকদের বেতন ৫৩ হাজার ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত প্রস্তাবে আপিল বিভাগের বিচারকের ব্যয় নিয়ামক ভাতা পাঁচ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে আট হাজার টাকা, ডোমেস্টিক এইড ভাতা ১ হাজার ৪৬৫ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৪ হাজার টাকা, সরকারি বাসা না পেলে আবাসিক ভাতা ২৬ হাজার ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করলে তার খরচ ১৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা এবং সরকারি বা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করলে ভাতার পরিমাণ এক হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার টাকা করা হয়েছে।
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের বেতন ৪৯ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৯৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী, সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও হুইপদের বেতন ৪৭ হাজার ৮০০ থেকে বাড়িয়ে ৯২ হাজার টাকা করা হয়েছে। উপমন্ত্রীদের বেতন ৪৫ হাজার ১৫০ থেকে বাড়িয়ে ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে।
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকের ব্যয় নিয়ামক ভাতা তিন হাজার থেকে বাড়িয়ে পাঁচ হাজার, ডোমেস্টিক এইড ভাতা ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ হাজার, সরকারি বাসা না পেলে আবাসিক ভাতা ২৬ হাজার ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করলে তার খরচ ১৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার, সরকারি বা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করলে তার ভাতা এক হাজার থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার টাকা করা হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে জাতীয় সংসদের সদস্যরা প্রতি মাসে বেতন হিসেবে পাবেন ৫৫ হাজার টাকা, যা এত দিন ২৭ হাজার ৫০০ টাকা ছিল। বিমানযোগে ভ্রমণের সময় দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে বা কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করলে বিদ্যমান ১০ লাখ টাকা বহাল রাখা হয়েছে। তবে সাংসদদের বিদ্যমান দৈনিক ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা, স্বেচ্ছাধীন তহবিল তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করা হয়েছে।
সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী এলাকার খরচ ভাতা পাবেন বিদ্যমান সাড়ে ৭ হাজারের পরিবর্তে ১২ হাজার ৫০০ টাকা, মাসে পরিবহন খরচ ৪০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৭০ হাজার, বার্ষিক অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয় ৭৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার, মাসিক লন্ড্রি ভাতা এক হাজার থেকে বাড়িয়ে দেড় হাজার এবং ক্রোকারিজসহ অন্যান্য মাসিক ভাতা চার হাজার থেকে বাড়িয়ে ছয় হাজার টাকা করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট অন্যদের নিজস্ব বাড়িতে থাকার ক্ষেত্রে ভাতা, আকাশপথে ভ্রমণে বিমাসুবিধা, দৈনিক ভাতা ও স্বেচ্ছাধীন তহবিল এবং আনুষঙ্গিক ভাতাও বাড়ানো হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বেসামরিক ও সামরিক পদের জন্য অষ্টম বেতনকাঠামোর গেজেট চলতি মাসে বা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশ করা হতে পারে। বৈঠকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০১৫ আইন হিসেবে প্রণয়নের জন্য দ্রুত জাতীয় সংসদে পাঠানোর প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়।
এ ছাড়া বৈঠকে অবহিত করা হয়, বাংলাদেশ অভিবাসন এবং ২০১৬ সালের জন্য উন্নয়ন-সম্পর্কিত বৈশ্বিক ফোরামের সভাপতি হয়েছে। ইউনেসকো ঢাকায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিটিউটকে তৃতীয় ক্যাটাগরি থেকে দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে উন্নীত করেছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক গভর্নর অব দ্য ইয়ার-২০১৫ ফর এশিয়া’ মনোনীত হয়েছেন। এসব সাফল্যে মন্ত্রিসভা সন্তোষ প্রকাশ করে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বৈঠকে আলোচ্যসূচির বাইরে বিজ্ঞান গবেষকদের অবসরের বয়স নির্দিষ্ট করার বিষয়টি উঠলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বলা হয়েছে, পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশে যেভাবে সিদ্ধান্ত হয়, তা পর্যালোচনা করে এ বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।
নতুন বেতন–ভাতার প্রস্তাব অনুমোদন
| আগে | নতুন | |
|---|---|---|
| রাষ্ট্রপতি | ৬১ হাজার ২০০ | ১ লাখ ২০ হাজার |
| প্রধানমন্ত্রী | ৫৮ হাজার ৬০০ | ১ লাখ ১৫ হাজার |
| স্পিকার | ৫৭ হাজার ২০০ | ১ লাখ ১২ হাজার |
| প্রধান বিচারপতি | ৫৬ হাজার টাকা | ১ লাখ ১০ হাজার |